ভঙ্গুর অর্থনীতির কঠিন পরীক্ষায় বিএনপি সরকার
ভঙ্গুর অর্থনীতির কঠিন পরীক্ষায় বিএনপি সরকার
সংবাদ ২৪ ঘন্টা
২৬ মে ২০২৬
ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে ক্ষমতায় আসে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার। ২৭ মে পূর্ণ হতে যাচ্ছে সরকারের প্রথম ১০০ দিন। সাধারণত নতুন সরকারের প্রথম ১০০ দিনকে নীতিনির্ধারণ, প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস ও অর্থনৈতিক রোডম্যাপ তৈরির সময় হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু এবারের বাস্তবতা ছিল ভিন্ন। নতুন সরকারকে শুরু থেকেই মোকাবিলা করতে হয়েছে— এক ভঙ্গুর অর্থনীতি, দুর্বল ব্যাংকিং ব্যবস্থা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ডলার সংকট, বিনিয়োগ স্থবিরতা এবং দীর্ঘদিনের আর্থিক অব্যবস্থাপনার উত্তরাধিকার।
ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকেই সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা দাবি করে আসছেন—তারা একটি ‘ক্ষতবিক্ষত অর্থনীতি’ উত্তরাধিকার হিসেবে পেয়েছেন। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, বিগত সরকারগুলো দেশের অর্থনীতিকে বিপর্যস্ত অবস্থায় রেখে গেছে এবং সেই ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে অন্তত দুই বছর সময় লাগবে। তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন বলেছেন, আগের সরকারের দুর্নীতি ও লুটপাটের কারণে বর্তমান সরকারকে প্রায় ৩০ লাখ কোটি টাকার ঋণের বোঝা নিয়ে কাজ শুরু করতে হয়েছে।
একই সুর শোনা গেছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বক্তব্যেও। জেলা প্রশাসক সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, “রাষ্ট্র ও জনগণকে ৩০ লাখ কোটি টাকার ঋণের বোঝা কাঁধে নিয়ে বর্তমান সরকারকে কাজ শুরু করতে হয়েছে।” তিনি আরও বলেন, ‘‘দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে দুর্বল অর্থনীতি, বিভক্ত প্রশাসন ও অবনতিশীল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির মধ্যেই সরকার দায়িত্ব নিয়েছে।’’
১০০ দিনের বাস্তবতা: সংকট সামলানোর লড়াই
সরকারের প্রথম ১০০ দিনের অর্থনৈতিক বাস্তবতা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়—এই সময়ের বড় অংশজুড়ে ছিল সংকট নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, রিজার্ভের চাপ, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, ডলারের অস্থিরতা, খেলাপি ঋণ, শিল্প খাতে জ্বালানি সংকট এবং বিনিয়োগে স্থবিরতা—সব মিলিয়ে অর্থনীতি ছিল এক জটিল অবস্থায়।
অর্থনীতিবিদদের মতে, সরকার এখনও বড় ধরনের অর্থনৈতিক ধস এড়াতে সক্ষম হলেও স্থিতিশীলতা পুরোপুরি ফিরিয়ে আনতে পারেনি। বরং অর্থনীতির অনেক সূচক এখনও ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা
সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ। গত কয়েক বছরে খাদ্যপণ্যের দাম ধারাবাহিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পায়। চাল, ডাল, ভোজ্যতেল, ডিম, মাছ, মাংস, সবজিসহ প্রায় সব নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়তে থাকে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের এপ্রিলে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের ওপরে অবস্থান করছে। খাদ্য ও খাদ্যবহির্ভূত—উভয় খাতেই মূল্যস্ফীতির চাপ রয়েছে। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবার সবচেয়ে বেশি সংকটে পড়েছে। সরকার বাজার তদারকি বাড়িয়েছে, কিছু পণ্যে আমদানি শুল্ক কমিয়েছে এবং আমদানি সহজ করার উদ্যোগ নিয়েছে। পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংক সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি অনুসরণ করছে। তবে এখনও বাজারে কাঙ্ক্ষিত স্বস্তি ফেরেনি।
মধ্যবিত্তের নীরব সংকট
অর্থনীতির এই চাপে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে মধ্যবিত্ত শ্রেণি। বেতন বা আয় না বাড়লেও শিক্ষা, চিকিৎসা, বাসাভাড়া, পরিবহন ও খাদ্য ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় অনেক পরিবার সঞ্চয় ভেঙে চলতে বাধ্য হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, নিম্ন আয়ের মানুষ সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির কিছু সুবিধা পেলেও মধ্যবিত্তের জন্য কার্যকর সহায়তা কম। ফলে তাদের জীবনযাত্রার মান দ্রুত নেমে যাচ্ছে।
রিজার্ভ ও ডলার সংকট এখনও বড় চাপ
সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল চাপের মধ্যে। ডলারের বিপরীতে টাকার মান কমে যাওয়ায় আমদানি ব্যয় বেড়ে যায়। শিল্পকারখানাগুলো কাঁচামাল আমদানিতে সমস্যায় পড়ে এবং এলসি খোলার ক্ষেত্রেও জটিলতা তৈরি হয়। রেমিট্যান্স প্রবাহ কিছুটা বেড়েছে এবং সরকার বাজারভিত্তিক বিনিময় হারের দিকে এগিয়েছে। এতে পরিস্থিতির কিছু উন্নতি হলেও রিজার্ভ এখনও স্বস্তিদায়ক অবস্থায় পৌঁছায়নি।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বৈদেশিক খাতে স্থিতিশীলতা আনতে হলে রফতানি বহুমুখীকরণ এবং বৈধ পথে রেমিট্যান্স বাড়ানো জরুরি।
ব্যাংক খাতে আস্থা সংকট
সরকারের প্রথম ১০০ দিনের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ ছিল ব্যাংকিং খাত। দীর্ঘদিনের অনিয়ম, রাজনৈতিক প্রভাব, খেলাপি ঋণ এবং অর্থপাচারের কারণে ব্যাংক খাতে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে।
সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান বলেছেন, ব্যাংকিং খাত থেকে ঋণের নামে প্রায় ৫ লাখ কোটি টাকা চুরি হয়েছে, যার বড় অংশ বিদেশে পাচার হয়ে গেছে। তাঁর ভাষায়, “ব্যাংকিং সিস্টেমের এক-তৃতীয়াংশ টাকাই নেই।” এই বক্তব্য দেশের আর্থিক খাতের প্রকৃত দুরবস্থাকে সামনে নিয়ে এসেছে। কিছু ব্যাংকে আমানতকারীদের মধ্যে আতঙ্কও দেখা যায়।
বাংলাদেশ ব্যাংক ইতোমধ্যে দুর্বল ব্যাংক একীভূতকরণ, নজরদারি জোরদার এবং আর্থিক পুনর্গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ব্যাংকিং ব্যবস্থা ছাড়া দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীলতা ফিরবে না।
স্থবির বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের সংকট
উচ্চ সুদহার, জ্বালানি অনিশ্চয়তা, ডলার সংকট এবং দুর্বল চাহিদার কারণে বেসরকারি বিনিয়োগ কমে গেছে। নতুন শিল্প স্থাপনে উদ্যোক্তারা সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন।
ফলে কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি কমেছে। বিশেষ করে উচ্চশিক্ষিত তরুণদের মধ্যে বেকারত্ব বাড়ছে। শ্রমবাজারে চাপ তৈরি হওয়ায় সামাজিক অস্থিরতার আশঙ্কাও বাড়ছে।
ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এমসিসিআই তাদের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, দেশের অর্থনীতি এখনও “ভঙ্গুর ও অসম পুনরুদ্ধারের” মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সংগঠনটির মতে, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, নিম্ন প্রবৃদ্ধি, দুর্বল অভ্যন্তরীণ চাহিদা এবং কঠোর মুদ্রানীতির কারণে বিনিয়োগ ও উৎপাদন কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
রফতানি খাতে বাড়ছে চাপ
বাংলাদেশের রফতানি খাত এখনও মূলত তৈরি পোশাক শিল্পনির্ভর। কিন্তু বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্কনীতি এবং ইউরোপীয় বাজারে চাহিদা কমে যাওয়ার কারণে রফতানি খাত চাপের মুখে পড়েছে।
শিল্প উদ্যোক্তারা বলছেন, বিদেশি ক্রেতারা অর্ডার কমাচ্ছেন এবং মূল্যছাড়ের চাপ দিচ্ছেন। অপরদিকে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।
বিশেষ করে তৈরি পোশাক ও ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্পে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ছে।
জ্বালানি সংকট: শিল্প উৎপাদনে নতুন চাপ
শিল্পাঞ্চলগুলোতে গ্যাস ও বিদ্যুতের ঘাটতি এখন বড় উদ্বেগের কারণ। উদ্যোক্তাদের অভিযোগ, অনেক এলাকায় প্রতিদিন কয়েক ঘণ্টা উৎপাদন বন্ধ রাখতে হচ্ছে।
জ্বালানি সংকটের কারণে শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় রফতানি আয়েও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। একই সঙ্গে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় দেশীয় বাজারেও মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়ছে।
রাজস্ব আদায়ে চাপ
অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড মন্থর থাকায় রাজস্ব আদায়েও চাপ তৈরি হয়েছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে হিমশিম খাচ্ছে। সরকার রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব প্রশাসন আলাদা করার উদ্যোগ নিয়েছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, করের হার না বাড়িয়ে করজাল সম্প্রসারণ এবং স্বচ্ছ প্রশাসন নিশ্চিত করাই এখন জরুরি।
অর্থনীতি চাঙা করতে বড় ঋণ প্যাকেজ
অর্থনীতিতে গতি ফেরাতে বাংলাদেশ ব্যাংক সম্প্রতি ৬০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ ঋণ সহায়তা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। এর মধ্যে বন্ধ শিল্পকারখানা চালু, কৃষি, সিএমএসএমই, রফতানি বৈচিত্রকরণ, যুব কর্মসংস্থান এবং স্টার্টআপ খাতে অর্থায়ন করা হবে।
গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান বলেছেন, বর্তমানে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশের নিচে নেমে গেছে। ব্যবসায়ীদের হাতে কার্যকর মূলধন নেই। তাই অর্থনীতিকে ‘বুস্ট’ করতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তবে অর্থনীতিবিদদের একাংশ আশঙ্কা করছেন, উচ্চ মূল্যস্ফীতির মধ্যে বড় আকারের ঋণ সহায়তা নতুন করে বাজারে চাপ তৈরি করতে পারে। যদিও কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে, এই অর্থ নতুন টাকা ছাপিয়ে নয়— ব্যাংকিং খাতের বিদ্যমান তারল্য থেকেই আসবে।
সামনে কী অপেক্ষা করছে
বিশ্লেষকদের মতে, সরকারের প্রথম ১০০ দিন ছিল মূলত সংকট সামাল দেওয়ার সময়। এখন সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো অর্থনীতিতে আস্থা ফিরিয়ে আনা।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, ব্যাংক খাত সংস্কার, বিনিয়োগ বাড়ানো, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বৈদেশিক খাত স্থিতিশীল করা—এই পাঁচটি খাতেই দ্রুত অগ্রগতি দেখাতে না পারলে সামনে পরিস্থিতি আরও কঠিন হতে পারে।
অর্থনীতিবিদদের ভাষায়, বাংলাদেশ এখন ‘ভঙ্গুর পুনরুদ্ধারের’ মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। অর্থনীতি পুরোপুরি ধসে পড়েনি, আবার স্থিতিশীলতাও ফেরেনি। ফলে সরকারের পরবর্তী সময়ের নীতি ও বাস্তবায়ন দক্ষতার ওপরই নির্ভর করবে অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াতে পারবে কিনা।
তথ্যসূত্র: বাংলাট্রিবিউন
শেয়ার করুন
বস্তনিষ্ঠ সংবাদের একমাত্র অনলাইন ঠিকানা