অসম্পূর্ণ সড়কে দুর্ভোগ

ছয় বছরেও শেষ হয়নি দেড় কিমি সড়ক, ভোগান্তিতে চারঘাট-বাঘা

স্টাফ রিপোর্টার প্রকাশ : ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৪:১৯ পিএম আপডেট : ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৭:৪৭ পিএম ২৬ বার পঠিত
ছয় বছরেও শেষ হয়নি দেড় কিমি সড়ক, ভোগান্তিতে চারঘাট-বাঘা
ছবি: সংবাদ ২৪ ঘন্টা
২৭ সেপ্টে ২০২৬ | sangbad24ghonta.com
ছয় বছরেও শেষ হয়নি দেড় কিমি সড়ক, ভোগান্তিতে চারঘাট-বাঘা
বিস্তারিত কমেন্টে ↘

রাজশাহীর পুঠিয়ার বানেশ্বর থেকে চারঘাট ও বাঘা হয়ে পাবনার ঈশ্বরদী পর্যন্ত ৫৪ কিলোমিটার আঞ্চলিক মহাসড়কের প্রায় পুরো অংশের কাজ শেষ হয়েছে তিন বছর আগে। কিন্তু ছয় বছর ধরে আটকে আছে চারঘাট ও বাঘা উপজেলা সদরের মাত্র দেড় কিলোমিটার সড়কের কাজ। ফলে গুরুত্বপূর্ণ এই আঞ্চলিক মহাসড়ক এখন স্থানীয়দের পাশাপাশি দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের হাজারো যাত্রীর দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

দেড় কিলোমিটার সড়কের কোথাও খোঁড়াখুঁড়ি, কোথাও বড় বড় গর্ত। সামান্য বৃষ্টিতেই জমছে হাঁটুপানি, আর শুকনো মৌসুমে উড়ছে ধুলা। যানবাহন চলছে ধীরগতিতে। স্বাভাবিক সময়ে পাঁচ মিনিটের পথ পাড়ি দিতে কখনও কখনও এক থেকে দুই ঘণ্টা পর্যন্ত সময় লাগছে। তৈরি হচ্ছে যানজট, ঘটছে ছোটখাটো দুর্ঘটনা। সড়কের দুই পাশে দোকানপাট ভেঙে ফেলা হলেও অনেক ব্যবসায়ী নতুন করে ব্যবসা শুরু করতে পারছেন না।

 

স্থানীয়দের অভিযোগ, ভূমি অধিগ্রহণ জটিলতা, বারবার দরপত্র ও ঠিকাদার পরিবর্তন এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর সমন্বয়হীনতার কারণে বছরের পর বছর ধরে এই ভোগান্তি চলছে।

 

৫৪ কিলোমিটারের মধ্যে আটকে দেড় কিলোমিটার

সড়ক ও জনপথ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, পুঠিয়ার বানেশ্বর থেকে চারঘাট-বাঘা হয়ে নাটোরের লালপুর দিয়ে পাবনার ঈশ্বরদী পর্যন্ত সড়কটির দৈর্ঘ্য ৫৪ কিলোমিটার। ৫৫৪ কোটি টাকা ব্যয়ে ১৮ ফুট প্রশস্ত সড়কটি ৩৪ ফুটে উন্নীত করার প্রকল্প নেওয়া হয়। ২০২০ সালে শুরু হওয়া প্রকল্পের কাজ ২০২২ সালের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ করার কথা ছিল।

 

পরে তিন দফায় প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো হয়। চারঘাট ও বাঘা বাজারের দেড় কিলোমিটার অংশ বাদে বাকি প্রায় সাড়ে ৫২ কিলোমিটার সড়কের কাজ ২০২৩ সালের ডিসেম্বরেই শেষ হয়। সাতটি প্যাকেজে সাতজন ঠিকাদার প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করেন।

 

তবে চারঘাট ও বাঘা উপজেলা সদরের বাজার এলাকার দেড় কিলোমিটার অংশ ভূমি অধিগ্রহণ জটিলতায় আটকে যায়। ফলে নতুন সড়কের সুফল পুরোপুরি পাচ্ছেন না স্থানীয় বাসিন্দা ও দূরপাল্লার যানবাহনের যাত্রীরা।

 

একাধিকবার দরপত্র, কাটেনি দুর্ভোগ

সড়ক বিভাগ সূত্রে জানা যায়, ২০২৫ সালের ২০ মার্চ দেড় কিলোমিটার অংশে আরসিসি ঢালাই সড়ক, ড্রেন নির্মাণ ও আলোকায়নের জন্য প্রায় ২২ কোটি টাকা ব্যয়ে শামীম এন্টারপ্রাইজের সঙ্গে চুক্তি করা হয়। ওই বছরের ৩০ জুনের মধ্যে কাজ শেষ করার কথা ছিল।

 

তবে চুক্তির পরদিনই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সড়ক বিভাগকে চিঠি দিয়ে জানায়, অধিগ্রহণ করা জায়গা ফাঁকা না থাকায় নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করা সম্ভব হবে না। কাজ শুরুর প্রায় এক মাস পর প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হলে আবারও কাজ বন্ধ হয়ে যায়।

 

এরপর চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে দেড় কিলোমিটার অংশের জন্য নতুন করে প্রায় ১৯ কোটি টাকার দরপত্র আহ্বান করা হয়। নতুন ঠিকাদার কাজ শুরু করলেও স্থানীয়দের অভিযোগ, কাজের গতি অত্যন্ত ধীর।

পাঁচ মিনিটের পথ, কখনও দুই ঘণ্টা

সম্প্রতি চারঘাট ও বাঘা উপজেলা সদর ঘুরে দেখা যায়, বাঘা অংশে প্রায় এক হাজার মিটার এবং চারঘাট অংশে প্রায় ৫০০ মিটার সড়ক খুঁড়ে রাখা হয়েছে। কোথাও মাটি ও ইটের স্তূপ, কোথাও বড় গর্ত। বৃষ্টির পানি জমে কাদার সৃষ্টি হয়েছে।

স্থানীয়রা জানান, স্বাভাবিক সময়ে দুই উপজেলা সদরের এই দেড় কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে পাঁচ মিনিটের মতো সময় লাগে। কিন্তু সড়কের বেহাল অবস্থা ও যানজটের কারণে কখনও এক থেকে দুই ঘণ্টাও লেগে যাচ্ছে।

সড়কের দুই পাশে অনেক দোকানপাট ভেঙে ফেলা হয়েছে। জায়গা হারিয়ে বহু ব্যবসায়ী নতুন করে ব্যবসা শুরু করতে পারছেন না। এর প্রতিবাদে ব্যবসায়ীরা একাধিকবার সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভও করেছেন।

 

‘ছয় বছর ধরে ব্যবসা বন্ধ’

চারঘাট বাজার এলাকার অধিগ্রহণ করা জমির মালিক জিল্লুর রহমান বলেন, ‘শতাধিক ব্যক্তির জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। কিন্তু এখনও অর্ধেকের বেশি মানুষ ক্ষতিপূরণের টাকা পাননি। জনদুর্ভোগের কথা বিবেচনা করে টাকা না পেলেও আমরা কাজ করার অনুমতি দিয়েছিলাম। কিন্তু দোকানপাট ও রাস্তা ভেঙে ফেলে রাখা হয়েছে। এরপর কাজ হচ্ছে না। এতে জমিও হারিয়েছি, ব্যবসাও করতে পারছি না।’

 

বাঘা বাজারের ইলেকট্রনিকস ব্যবসায়ী মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘বাজারের আগে-পরে সব জায়গায় ভালো রাস্তা। শুধু বাজার এলাকায় চলাচলের কোনো উপায় নেই। একটু বৃষ্টি হলেই দোকানের সামনে হাঁটুপানি জমে। রোদে ধুলায় টেকা যায় না। গত ছয় বছর ধরে ব্যবসা নেই বললেই চলে।’

 

যানজট এড়াতে ঘুরতে হচ্ছে প্রায় ৫০ কিলোমিটার

খুলনা থেকে রূপপুর-রাজশাহী রুটে চলাচলকারী ট্রাকচালক মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘রাজশাহীর সঙ্গে খুলনা ও বরিশাল বিভাগের যানবাহন চলাচলে এই দেড় কিলোমিটারই সবচেয়ে বড় ভোগান্তি। যানজট এড়াতে কখনও প্রায় ৫০ কিলোমিটার ঘুরে যেতে হয়। দেড় কিলোমিটার রাস্তার কাজ শেষ না হওয়ায় যদি এত দুর্ভোগ হয়, তাহলে বাকি সাড়ে ৫২ কিলোমিটার সড়কও একসময় নষ্ট হয়ে যাবে।’

 

চারঘাট বাজার ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক আকরাম হোসেন বলেন, ‘চারঘাট ও বাঘা ঐতিহ্যবাহী উপজেলা। বাইরে থেকে কেউ এলে মনে হবে যুদ্ধবিধ্বস্ত এলাকায় এসেছে। অধিগ্রহণের নামে দোকান ভেঙে ফেলে রাখা হয়েছে, রাস্তা খুঁড়ে রাখা হয়েছে। বারবার দরপত্র হচ্ছে, কিন্তু কাজ শেষ হচ্ছে না।’

 

‘দেড় কিলোমিটারই পুরো অঞ্চলের বড় ভোগান্তি’

নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের চারঘাট উপজেলা আহ্বায়ক সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘জমি অধিগ্রহণ শেষ না করেই প্রকল্প নেওয়া এবং কাজের মধ্যে সমন্বয় না থাকায় এমন পরিস্থিতি হয়েছে। বারবার প্রকল্প নিয়ে কিছু অংশের কাজ করা হচ্ছে, আবার বাকি অংশ ফেলে রাখা হচ্ছে। দেড় কিলোমিটার সড়ক এখন পুরো অঞ্চলের বড় ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।’

 

চারঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জান্নাতুল ফেরদৌস বলেন, ‘দুই উপজেলা সদরের দেড় কিলোমিটার সড়কের দুর্ভোগের বিষয়টি জেলার প্রতিটি সভাতেই দুই ইউএনও উপস্থাপন করে আসছি। সড়ক ও জনপথ বিভাগ বারবার কাজ শেষ করার আশ্বাস দিচ্ছে। কিন্তু এখনও কাজ শেষ হয়নি।’

নভেম্বর-ডিসেম্বরে শেষ করার আশা

সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর রাজশাহীর উপবিভাগীয় প্রকৌশলী আব্দুল মান্নাফ আকন্দ বলেন, ‘দেড় কিলোমিটার সড়কের কারণে মানুষের ভোগান্তির বিষয়টি আমরাও দেখছি। ভূমি অধিগ্রহণ জটিলতার কারণেই মূলত এ অবস্থা তৈরি হয়েছিল। দেড় কিলোমিটার অংশের কাজের জন্য আবারও প্রায় ১৯ কোটি টাকায় চুক্তি হয়েছে। আগামী নভেম্বর-ডিসেম্বরের মধ্যে কাজ শেষ হবে বলে আশা করছি।’

 

ভূমি অধিগ্রহণের বিষয়ে রাজশাহী জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সিনিয়র সহকারী কমিশনার (ভূমি অধিগ্রহণ শাখা) মো. আরিফ হোসেন বলেন, ‘বেশিরভাগ মানুষ টাকা পেয়েছেন। অনেকের কাগজপত্রে জটিলতা ও জমির মামলা থাকায় টাকা পেতে কিছুটা দেরি হতে পারে। নিয়ম অনুযায়ী অনেক আগেই সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরকে জমি বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। একজন ব্যক্তি টাকা পেলেও অধিগ্রহণ সম্পূর্ণ হয়েছে বলে গণ্য হয়।’

 

ভোগান্তি শেষ হবে কবে?

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সঙ্গে রাজশাহী শহর ও বিমানবন্দরের যোগাযোগ এবং খুলনা-বরিশালসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের যানবাহন চলাচলে এই সড়কটির গুরুত্ব রয়েছে। অথচ গুরুত্বপূর্ণ এই মহাসড়কের মাত্র দেড় কিলোমিটার অংশই বছরের পর বছর ধরে দুর্ভোগের কারণ হয়ে আছে।


স্থানীয়দের প্রত্যাশা, এবার যেন আর কোনো নতুন জটিলতা বা অজুহাতে কাজ বন্ধ না হয়। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দেড় কিলোমিটার সড়ক, ড্রেন ও আলোকায়নের কাজ শেষ করে দীর্ঘদিনের ভোগান্তির অবসান ঘটানো হবে—এটাই এখন চারঘাট-বাঘাবাসীসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের দাবি।

সম্পর্কিত নিউজ

অ্যাপ ইনস্টল করুন

এই নিউজ পোর্টালটি মোবাইল অ্যাপের মতো ব্যবহার করুন।