ফুল চাষের নামে ৫০ বিঘা খাসজমিতে প্লট বাণিজ্য!
ফুল চাষের নামে ৫০ বিঘা খাসজমিতে প্লট বাণিজ্য!
সংবাদ ২৪ ঘন্টা
১১ মে ২০২৬
নিজস্ব প্রতিবেদক: বিদেশে রপ্তানিযোগ্য ফুল চাষের নামে সরকারের কাছ থেকে প্রায় ৫০ বিঘা খাসজমি লিজ নেয় একটি প্রভাবশালী চক্র। শর্ত ছিল, আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর ফুল চাষ করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা।
কিন্তু দুই দশক পেরিয়ে গেলেও সেখানে গড়ে ওঠেনি কোনো ফুলের বাগান। বরং বছরের পর বছর জমিতে ধান ও সবজি চাষ চলছে। এখন সেই জমি বালু ভরাট করে আবাসিক ও বাণিজ্যিক প্লট তৈরির প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, জলবায়ু পরিবর্তনের অজুহাত দেখিয়ে প্রকল্পের ধরন বদলে একই জমি আবাসিক ও শিল্পকারখানার কাজে ব্যবহারের অনুমতি চাওয়া হয়েছে। অথচ লিজের শর্ত অনুযায়ী, ফুল চাষ ছাড়া অন্য কোনো কাজে জমি ব্যবহার করলে লিজ বাতিল হওয়ার কথা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, শুরু থেকেই ফুল চাষ ছিল কেবল খাসজমি দখল ও পরে প্লট ব্যবসার কৌশল। বিষয়টি সামনে আসার পর খাসজমিতে কোনো অবৈধ কার্যক্রম করতে দেওয়া হবে না বলে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছেন ভূমিমন্ত্রী মিজানুর রহমান মিনু।
প্রায় ২০ বছর আগে একটি চক্র ভূমি মন্ত্রণালয়ে বিদেশে রপ্তানিযোগ্য ফুল চাষ প্রকল্পের প্রস্তাব দেয়। প্রকল্পে বিপুল বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে ফুল রপ্তানির নানা আশ্বাস দেওয়া হয়। সেই প্রস্তাবে আকৃষ্ট হয়ে সরকার বিশেষ শর্তে দীর্ঘমেয়াদি লিজ দেয় প্রায় ৫০ বিঘা খাসজমি।
লিজ চুক্তিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ ছিল, জমিটি শুধু রপ্তানিযোগ্য ফুল চাষের জন্য ব্যবহার করতে হবে। কিন্তু বাস্তবে সেখানে কোনো ফুল চাষের উদ্যোগ দেখা যায়নি। বর্তমানে জমির অধিকাংশ অংশে মৌসুমি ধান চাষ হচ্ছে। কিছু অংশ দীর্ঘদিন ধরে পতিত রয়েছে।
নথিপত্র ঘেঁটে দেখা গেছে, রাজশাহী নগরীর লক্ষ্মীপুরের প্যারামেডিক্যাল এলাকার গোলাম মোস্তফা গং হাড়ুপুর মৌজায় ৯৭/৬২-৬৩ নম্বর এলএ কেসের আওতাভুক্ত অব্যবহৃত ১৫ দশমিক ৮৮ একর জমি বাণিজ্যিক ভিত্তিতে বিদেশে রপ্তানিযোগ্য ফুল চাষের জন্য লিজ নেওয়ার আবেদন করেন।
অকৃষি খাসজমি ব্যবস্থাপনা ও বন্দোবস্ত নীতিমালা অনুযায়ী ২০০১ সালের ১৬ আগস্ট মাত্র ২৭ লাখ ৩৭ হাজার ৫৯২ টাকা সেলামিতে লিজ দেয় ভূমি মন্ত্রণালয়। তবে মামলাসহ নানা জটিলতায় জমির দখল পেতে কয়েক বছর সময় লাগে।
জেলা প্রশাসকের পক্ষে পবা উপজেলার তৎকালীন সহকারী কমিশনার (ভূমি) শেখ এহসান উদ্দীন ৩৫ বছরের জন্য গোলাম মোস্তফাসহ অন্যদের নামে লিজ দেন। পবার তৎকালীন সাব-রেজিস্ট্রার রওশন আরা বেগমের স্বাক্ষরে ২০২১ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর দলিল রেজিস্ট্রি হয়। কিন্তু ওই জমিতে মোস্তফা গং ফুল চাষ করেননি।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, পূর্বপাশজুড়ে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। ধান পাকতেও শুরু করেছে। আর কয়েক দিনের মধ্যেই সেই ধান ঘরে তোলা হবে। জমির কিছু অংশে সবজি চাষ করা হয়েছে। আর পশ্চিম অংশে রাজশাহী-চাঁপাইনবাবগঞ্জ মহাসড়ক ঘেঁষে বালু ভরাট শুরু হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা বেলাল উদ্দিন, সাহাবুল ইসলাম ও ফারুক হোসেন বলেন, আমরা শুনে আসছি এখানে ফুল চাষের জন্য মোস্তফা লিজ নিয়েছেন। কিন্তু আজ পর্যন্ত একটি ফুলের গাছও দেখিনি। এখন শুনছি জমি প্লট করে বিক্রি করা হবে। এটি আসলে শুরু থেকেই জমি দখলের পরিকল্পনা ছিল।
ফুল চাষ ছিল শুধু অজুহাত। আওয়ামী লীগ আমলে ওয়ার্ড কাউন্সিলর রজব আলী এই জমির কিছু অংশ দখলে রেখে বালুর ব্যবসা করেছিলেন।
পরে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর মোস্তফা জমির দখল নেন। সিটি করপোরেশন সড়কের ধার ব্লক দিয়ে বাঁধাইয়ের কাজ করছিল। তখন মোস্তফা বাধা দিয়ে কাজ বন্ধ করে দেন।
পরে কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে সড়কের জমিও দখল করেন। তারা আরও বলেন, সরকারি জমি লিজ নিয়ে মোস্তফা কোনোভাবেই প্লট করতে পারেন না।
এদিকে ২০২৩ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর গোলাম মোস্তফা গং শিল্প-কলকারখানা ও আবাসিক কাজে ব্যবহারের জন্য পুনরায় লিজ নেওয়ার আবেদন করেন ভূমি মন্ত্রণালয়ের সচিবের কাছে। এতে তিনি উল্লেখ করেন, জলবায়ু পরিবর্তন ও পদ্মা নদীর প্রভাবে ফুল চাষ অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
তাই ফুল চাষ বাদ দিয়ে ওই জমি বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহারের জন্য শিল্প-কলকারখানা ও আবাসিক প্রকল্পে রূপান্তরের অনুমতি চান।
খাসজমির সর্বশেষ পরিস্থিতি জানতে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে তথ্য অধিকার আইনে আবেদন করা হলে জানানো হয়, গোলাম মোস্তফা আবেদনে উল্লেখ করেছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তিনি ফুল চাষের কার্যক্রম চালু করতে পারেননি। তাই এখন ওই জমি আবাসিক কাজে ব্যবহারের জন্য নতুন করে লিজ চান।
ভূমি মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে জেলা প্রশাসকের মতামত জানতে চেয়েছে। জেলা প্রশাসনের নির্দেশে সরেজমিন পরিদর্শন করে একটি প্রতিবেদন তৈরি করেছে পবার ভূমি অফিস।
প্রতিবেদনে বলা হয়, রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (আরডিএ) এবং রাজশাহী সিটি করপোরেশনের মাস্টারপ্ল্যানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হলে আবাসিক কাজে ব্যবহারের অনুমতি প্রদানে বাধা নেই।
পবা এসিল্যান্ডের সার্বিক মন্তব্যে গোলাম মোস্তফা গংকে আবাসিক কাজে ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া যেতে পারে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে। অথচ ভূমি মন্ত্রণালয়ের দেওয়া লিজের শর্ত অনুযায়ী, ওই জমিতে রপ্তানিযোগ্য ফুল চাষ ছাড়া অন্য কিছু করলে লিজ বাতিল হওয়ার কথা।
তবে গত ১২ মার্চ ভূমি মন্ত্রণালয়ের খাসজমি-১ শাখার উপসচিব আমিনুর রহমান স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে গোলাম মোস্তফাদের আবেদনের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তর ও সংস্থাগুলোর মতামত জানতে জেলা প্রশাসককে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে রাজশাহী জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের রেভিনিউ ডেপুটি কালেক্টর অভিজিত সরকার বলেন, একটি লিজ চলমান অবস্থায় দ্বিতীয়বার একই জমি লিজ দেওয়ার সুযোগ নেই। তবে নীতিমালা অনুযায়ী আমরা পুঙ্খানুপুঙ্খ সরেজমিন তদন্ত করে ভূমি মন্ত্রণালয়কে মতামত জানাব। তারাই পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেবে।
এ বিষয়ে গোলাম মোস্তফার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ২০০১ সালে লিজ পেলেও মামলার কারণে অনেক পরে রেজিস্ট্রি পেয়েছি। তা ছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ফুল চাষ করা যায়নি। তবে যা কিছুই করি আইনের বাইরে যাব না। এজন্য আপনাদের সহযোগিতা চাই।
ভূমি ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাজশাহীতে এখনও কয়েক হাজার মানুষ ছিন্নমূল অবস্থায় রয়েছে। তাদের ঘরবাড়ি নেই। অথচ আইনের ফাঁকফোকরে সুবিধাবাদী চক্র খাসজমি লিজ নিয়ে বাণিজ্যিক প্লট তৈরির চেষ্টা করছে। এটি অত্যন্ত দুঃখজনক। এ ধরনের চক্রের লাগাম টেনে ধরতে হবে। তাদের মতে, সরকারের কঠোর নজরদারির অভাবেই প্রভাবশালী মহল বারবার সুযোগ নিচ্ছে।
এক ব্যাক্তি বলে, স্বাধীনতার আগে সিঅ্যান্ডবি ইটভাটার জন্য জমিটি অধিগ্রহণ করা হলেও মালিকদের ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়নি। আদালতের ডিক্রি পাওয়ার পর উত্তরাধিকার হিসেবে ১৪ জনের পক্ষে আজগর আলী, মজিবুর রহমান ও মাসুদ রানা নামে তিন ব্যক্তি ২০২৪ সালের ২৬ জানুয়ারি চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের জন্য ভূমি মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেন। তাদের আবেদনে সুপারিশ করেছিলেন তৎকালীন ভূমিমন্ত্রী নারায়ণ চন্দ্র চন্দ। তবে আবেদনের পরও তারা ভূমি মন্ত্রণালয় থেকে তেমন কোনো সাড়া পাননি। সূত্র: ডেইলি বাংলাদেশ
শেয়ার করুন
বস্তনিষ্ঠ সংবাদের একমাত্র অনলাইন ঠিকানা