দ্রুতগতির নিউজরুমে সরকারি নথি বের করার আসল হাতিয়ার
তথ্য অধিকার: সাংবাদিকের হাতের সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র
তথ্য অধিকার: সাংবাদিকের হাতের সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র
সংবাদ ২৪ ঘন্টা
১৫ আগ ২০২৬
লুৎফর রহমান হিমেল
সাংবাদিকরা বক্তব্য চাইলেই ক্ষেপে যাচ্ছেন সাতক্ষীরার ডিসি!
মর্মান্তিক খবর বৈকি! সাংবাদিকরা নিজের জন্য এসব বক্তব্য বা তথ্য চান না। তারা জনস্বার্থে মিডিয়ায় প্রকাশের জন্য এসব বক্তব্য চেয়ে থাকেন। কিন্তু অনেক সাংবাদিকই এ বিষয়ে ভালো করে জানেন না, মানে তাদের যে তথ্য চাওয়ার লিগ্যাল অধিকার আছে, সে সম্পর্কে স্পেসিফিক রাইট সম্পর্কে তাদের জানা নেই।
সরকারি-বেসরকারি কর্মকর্তাদের কাছে সাংবাদিকদের সেই তথ্য চাওয়ার অধিকার নিয়ে কিছু কথা বলি।
চায়ে চুমুক দিয়ে একটু চোখ বন্ধ করে ভাবুন তো। কার্ল মার্ক্সের 'দাস ক্যাপিটাল' বা রুশোর লেখালেখি বিশ্বজুড়ে যেভাবে রাজনৈতিক ও সামাজিক বিপ্লব ঘটিয়েছিল, কোনো বিশাল সেনাদলও কি তা পেরেছিল? তাই তো প্রবাদ আছে, অসির চেয়ে মসি বড়। কিন্তু আজকের দিনে একজন অনুসন্ধানী সাংবাদিকের কাছে সবচেয়ে মূল্যবান অস্ত্র কোনটি? কলম, ক্যামেরা, রেকর্ডার, নাকি ভালো কোনো সোর্স? সবই দরকার। তবে অনুসন্ধানের এমন একটা পর্যায়ে গিয়ে রিপোর্টারকে এমন সব প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়, যার উত্তর কোনো প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে থাকে না, কোনো কর্মকর্তা ফোনে বলতে চান না, আর কোনো সোর্সও পুরোপুরি নিশ্চিত করে মুখ খুলতে পারেন না।
ঠিক সেই মুহূর্তে হাজির হয় তথ্য অধিকার। ধরা যাক, কোনো সরকারি প্রকল্পে পাঁচ শ কোটি টাকা খরচ হলো। তিন বছরের কাজ শেষ হলো পাঁচ বছরে, খরচ বাড়ল আরও দুই শ কোটি টাকা। কেন এই দেরি? কোন ঠিকাদার কাজ পেল? কাজের মান যাচাই হলো কি না? এসব প্রশ্নের উত্তর পেতে সাংবাদিক চাইলে দিনের পর দিন কর্মকর্তার দরজায় ঘুরতে পারেন, অথবা আইন যে দরজাটি খুলে দিয়েছে, সেটি ব্যবহার করতে পারেন।
২০০৯ সালে পাশ হওয়া এই তথ্য অধিকার আইন নাগরিক বা সাংবাদিককে কর্তৃপক্ষের কাছে থাকা তথ্য পাওয়ার অধিকার দিয়েছে। আইনের মূল দর্শনই হলো সরকারি কাজের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়ানো। ইমেইল বা অনলাইন মাধ্যম ব্যবহার করেও এখন লিখিতভাবে তথ্য চাওয়া যায়। কিন্তু কাগজের কলমে আইনটি যত শক্তিশালীই হোক না কেন, সাংবাদিকতার মাঠে আসল লড়াইটা শুরু হয় এখান থেকেই।
অনেকে তথ্য চাওয়াকে কর্মকর্তার ব্যক্তিগত সহযোগিতা বা দয়া হিসেবে দেখেন। জনসংযোগ কর্মকর্তাকে ফোন করে অনেক সময় বলতে শোনা যায়, “ভাই, একটু তথ্যটা দেন, চাকরিটা বাঁচে।” কিন্তু আইনের দর্শন একেবারেই আলাদা। এখানে সাংবাদিক বা নাগরিক কারও অনুগ্রহ চাইছেন না, বরং একটি আইনগত অধিকার প্রয়োগ করছেন। তথ্য কমিশনের নিয়ম অনুযায়ী, সাধারণ ক্ষেত্রে বিশ কার্যদিবসের মধ্যে এবং একাধিক ইউনিট জড়িত থাকলে ত্রিশ কার্যদিবসের মধ্যে তথ্য দিতে হয়। জীবন বা মৃত্যুর মতো জরুরি বিষয়ে চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যেও তথ্য পাওয়ার বিধান রয়েছে। অর্থাৎ সাংবাদিকের হাতে শুধু প্রশ্ন করার অধিকারই নেই, উত্তর আদায়ের আইনি প্রক্রিয়াও রয়েছে।
তবে কোন তথ্য চাওয়া যাবে আর কোনটা যাবে না, তা বুঝতে বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিতে হবে। “অমুক প্রকল্পে দুর্নীতি হয়েছে কি না জানাবেন”, এভাবে মতামত বা সিদ্ধান্ত না চেয়ে সুনির্দিষ্টভাবে বলতে হবে, “২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রকল্পটির অনুমোদিত বাজেট, সংশোধিত বাজেট, ঠিকাদারের তালিকা, কার্যাদেশ ও বিল পরিশোধের বিবরণ প্রদান করা হোক।” একটি ভালো আরটিআই বা রাইট টু ইনফরমেশন আবেদন মানেই আসলে একটি অনুসন্ধানের সুনির্দিষ্ট নকশা তৈরি করা। প্রাক্কলন থেকে শুরু করে কাজের মান যাচাইয়ের প্রতিবেদন পর্যন্ত প্রতিটি নথি একেকটি রহস্যের দরজা খুলে দেয়।
আইন ও কমিশন থাকার পরও সমস্যামূলত এর বাস্তব প্রয়োগে। দ্য ডেইলি স্টার-এর প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, ২০২৩ সালে তথ্য না পাওয়ার শত শত অভিযোগ জমা পড়েছিল এবং সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে গোপনীয়তার সংস্কৃতি ও আমলাতান্ত্রিক প্রতিরোধ এখনও বড় বাধা। খুলনা ও রাজশাহী অঞ্চলের সাংবাদিকদের নিয়ে করা এক গবেষণায় দেখা গেছে, বেশিরভাগ সাংবাদিক আইনটির কথা জানলেও অনেকে এর গভীরে বোঝেন না।
অথচ আইনটি শুধু কমিশনের নয়, সাংবাদিকদেরও ব্যবহার করতে জানতে হবে। বিশ দিন পার হয়ে তথ্য না পেলে আপিল করার সুযোগ রয়েছে, এমনকি তথ্য প্রদানে বাধা সৃষ্টিকারী কর্মকর্তার জন্য জরিমানার ব্যবস্থাও আইনে আছে।
স্বল্পসময়ের দ্রুতগতির নিউজরুম সংস্কৃতির কারণে সাংবাদিকরা অনেক সময় আরটিআই বা তথ্য অধিকারের দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় ধৈর্য রাখতে চান না। ব্রেকিং নিউজ আর লাইভের ভিড়ে ছয় মাস অপেক্ষা করে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন করার মানসিকতা হারাচ্ছেন অনেকে। অথচ অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা মানেই ধর-মার-কাট নয়; এটি ধৈর্য, অপেক্ষা এবং নথির নিখুঁত মেলবন্ধনের শিল্প। রয়টার্স ইনস্টিটিউটের প্রতিবেদনে মার্কিন অনুসন্ধানী সাংবাদিক জেসন লিওপোল্ডের দুই দশকে তেরো হাজারের বেশি পাবলিক রেকর্ড চাওয়ার দৃষ্টান্ত দেখায় যে, ফলোআপ আর নাছোড়বান্দা মনোভাব ছাড়া বড় অনুসন্ধান সম্ভব নয়। ১২০টির বেশি দেশে এই আইন আছে। কিন্তু এর সঠিক ব্যবহার জানে না বেশিরভাগ দেশের সাংবাদিকরা।
সোর্স আর তথ্য অধিকার এক জিনিস নয়। সোর্সের দেওয়া তথ্যের সঙ্গে যখন আইনি প্রক্রিয়ায় পাওয়া সরকারি নথি এবং মাঠের বাস্তবতা মিলে যায়, তখন সেই অনুসন্ধানী প্রতিবেদন পাথরের মতো শক্ত হয়ে দাঁড়ায়। তবে নথি হাতে এলেই সেটিই শেষ কথা নয়; নথিতে ভুল থাকতে পারে বা একপাক্ষিক অভিযোগ থাকতে পারে। তাই অভিযুক্তের বক্তব্য নেওয়া এবং সততা যাচাই করা অপরিহার্য। পাশাপাশি জাতীয় নিরাপত্তা বা ব্যক্তিগত গোপনীয়তার মতো কিছু ব্যতিক্রম বা আইনি সীমারেখাও মাথায় রাখতে হবে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডিজিটাল ডেটার যুগে আগামী দিনের তথ্য অধিকার আরও বেশি প্রযুক্তিনির্ভর হবে। কিন্তু এআই শুধু ডেটা সাজিয়ে দিলেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ও অনুসন্ধান রিপোর্টারকেই করতে হবে। রাষ্ট্র ও নাগরিকের সম্পর্কের মাপকাঠি হলো এই তথ্য অধিকার।
তাই নিউজরুমগুলোকে কেবল কাগজ, কলম, ক্যামেরার ওপর নির্ভর না করে, আইনটিকেও সাংবাদিকের প্রধান হাতিয়ার বানিয়ে মাঠে নামাতে হবে, কারণ অনেক সময় সবচেয়ে বড় খবরটি কোনো প্রেস কনফারেন্সে নয়, লুকিয়ে থাকে কোনো ধূলাধূসরিত ফাইলের গভীরে।
লেখক: সমালোচক
শেয়ার করুন
বস্তনিষ্ঠ সংবাদের একমাত্র অনলাইন ঠিকানা