দিনে সাড়ে চারশ টাকার বিনিময়ে ডাকঘরের সেবা সচল রাখা ১৩ জন শ্রমজীবীকে ১ নোটিশে বিদায়; রাষ্ট্রের সংবেদনশীলতা ও প্রশাসনিক ন্যায়বিচারের প্রশ্নে একটি খোলা কলাম।
অব্যাহতি দিয়ে ‘দায়মুক্ত’ রাষ্ট্র: ১৩টি পরিবারের রুটি-রুজির দায়িত্ব কে নেবে?
অব্যাহতি দিয়ে ‘দায়মুক্ত’ রাষ্ট্র: ১৩টি পরিবারের রুটি-রুজির দায়িত্ব কে নেবে?
সংবাদ ২৪ ঘন্টা
২১ আগ ২০২৬
অমানবিক দৈনিক মজুরির দিনলিপি
দৈনিক মজুরি মাত্র চারশ ৫০ টাকা। মাসের আট দিন সরকারি সাপ্তাহিক ছুটির দিনগুলোতে কোনো টাকা মেলে না। ঈদ কিংবা পহেলা বৈশাখের মতো উৎসবগুলোতে নেই কোনো ভাতা। কোনো দিন শারীরিক অসুস্থতার কারণে কাজে যেতে না পারলে কাটা যায় সেই দিনের মজুরিও। অথচ এই কঠিন ও বৈষম্যমূলক শর্ত মেনে নিয়েই বছরের পর বছর নিরবে-নিভৃতে নিজের শ্রম ঢেলে দেন একজন দৈনিক মজুরিভিত্তিক কর্মী। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের অন্যতম সেবামূলক রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ডাক বিভাগের গতিশীলতা বজায় রাখতে এই মানুষগুলোই দিনরাত পরিশ্রম করেন।
এখানেই মূল প্রশ্নটা ওঠে—রাষ্ট্রের সেবার চাকা সচল রাখতে যারা জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সময় ও মেধা বিলিয়ে দিলেন, দিনশেষে তারা কী পেলেন? রাজশাহী জিপিও-তে শ্রম দেওয়া এমন ১৩ জন কর্মচারীর পরিবারের রুজি-রুটি বন্ধ হয়ে গেল মাত্র এক নোটিশে।
এক নোটিশে ১৩টি পরিবারে অন্ধকার
গত ১৬ আগস্ট ২০২৬ খ্রি. রোববার রাজশাহী জিপিও (জেনারেল পোস্ট অফিস)-র সিনিয়র পোস্টমাস্টার (চলতি দায়িত্ব) আল আমিন স্বাক্ষরিত একটি নোটিশ টাঙানো হয় অফিসের নোটিশ বোর্ডে। ‘দৈনিক মজুরি ভিত্তিক কর্মচারীদের অব্যাহতি প্রদান’ শীর্ষক সেই নোটিশে রাজশাহী জিপিও এবং এর আওতাধীন সাব-পোস্ট অফিসে কর্মরত ১৩ জন কর্মচারীকে একতরফাভাবে চাকরিচ্যুত করার কথা জানানো হয়।
অব্যাহতি পাওয়া ১৩ জন অভিজ্ঞ ও দক্ষ কর্মচারীদের মধ্যে রয়েছেন:
দৈনিক মজুরিভিত্তিক পোস্টাল অপারেটর (৯ জন): মোঃ মমিনুল ইসলাম (রাজশাহী জিপিও), মো. শকিলুর রহমান (রাজশাহী জিপিও), শ্রী চৈতন্য দাস (রাজশাহী জিপিও), মোসাঃ জাহিদা খাতুন (রাজশাহী জিপিও), মোসাঃ পপি খাতুন (রাজশাহী জিপিও); মোঃ মাসুদ রানা (ঘোড়ামারা প্রধান ডাকঘর), মোসা. মনজিলা খাতুন (ঘোড়ামারা প্রধান ডাকঘর), মোঃ শামীউল আলীম (ঘোড়ামারা প্রধান ডাকঘর); এবং খন্দকার মতিউর রহমান (রাজশাহী কোর্ট টাউন সাব পোস্ট অফিস)।
দৈনিক মজুরিভিত্তিক প্যাকার (২ জন): মোসাঃ লতিফা খাতুন (রাজশাহী জিপিও) ও মোঃ হারুন আর রশিদ (রাজশাহী কোর্ট টাউন সাব পোস্ট অফিস)।
দৈনিক মজুরিভিত্তিক নৈশপ্রহরী (২ জন): মোঃ হানিফ শেখ (পদ্মা আবাসিক টাউন সাব পোস্ট অফিস) ও চৌধুরী আব্দুল কাদের (রাজশাহী ক্যান্টনমেন্ট টাউন সাব পোস্ট অফিস)।
যাদের অনেকেই দীর্ঘ ১৫ থেকে ১৮ বছর নিরবচ্ছিন্নভাবে সেবা দিয়েছেন, কোনো আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ বা কারণ দর্শানো নোটিশ ছাড়াই তাদের এভাবে বিদায় দেওয়া অত্যন্ত নির্দয় ও অনভিপ্রেত।
অবমূল্যায়ন, লাঞ্ছনা এবং শূন্য হাতে বিদায়
সাম্প্রতিক সময়ে ‘বাজেট নেই’ অজুহাতে দীর্ঘ ৫-৭ মাস তাদের মজুরি দেওয়া বন্ধ রাখা হয়েছিল। নিত্যপণ্যের এই আকাশছোঁয়া বাজারে প্রাপ্য মজুরি ছাড়া কীভাবে এই পরিবারগুলো দিনের পর দিন কাটিয়েছে, তা অনুমান করা কঠিন নয়। তবুও ডাকসেবায় কোনো বিঘ্ন ঘটতে দেননি তারা। দীর্ঘদিনের সেই বকেয়া পাওনা কর্তৃপক্ষ বুঝিয়ে দিয়েছেন গত ১৩ আগস্ট—অর্থাৎ অব্যাহতির ঠিক দুই দিন আগে। তবে চলতি আগস্ট মাসের মজুরিটুকুও তাদের হাতে তুলে দেওয়া হয়নি।
"রাষ্ট্রের অর্পিত দায়িত্ব পালন করার পর অর্জিত প্রাপ্যটুকু পেতেই যেখানে কালঘাম ছুটত, সেখানে উপহার স্বরূপ মিলল লাঞ্ছনা, অবমূল্যায়ন আর সর্বশেষে শূন্য হাতে অব্যাহতির চিঠি।"
মানবিক রাষ্ট্রনেতার দৃষ্টি আকর্ষণ
গত ১৫ এপ্রিল জাতীয় সংসদে দেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ৫ লক্ষ সরকারি কর্মচারী নিয়োগের ঘোষণা দিয়েছেন। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে যখন কর্মসংস্থান সৃষ্টির এমন মানবিক অঙ্গীকার করা হচ্ছে, ঠিক তখনই ডাকঘরের মতো সেবামূলক প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘদিন সেবা দেওয়া কর্মীদের এভাবে রাস্তায় বসিয়ে দেওয়া প্রশাসনিক দ্বিমুখী নীতিরই নামান্তর।
এই অন্যায্য সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে এবং ভুক্তভোগীদের স্বপদে পুনর্বহালের দাবিতে গত ১৯ আগস্ট রাজশাহী জিপিও-র প্রধান ফটকে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। এতে রাজশাহী বিভাগের বিভিন্ন সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত দপ্তরের শতাধিক কর্মচারী সংহতি প্রকাশ করে অংশ নেন। সিনিয়র পোস্টমাস্টারের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী ও প্রশাসনের শীর্ষ কর্তাদের কাছে স্মারকলিপিও দেওয়া হয়েছে।
এখন দেখার বিষয়, যাদের ঘাম ও শ্রমের ওপর দাঁড়িয়ে সচল ছিল ডাকসেবার গতিশীলতা, তাদের ঘরের চুলা কি আজীবন বন্ধই থাকবে? নাকি দেশের মানবিক প্রধানমন্ত্রী ও নীতিপ্রণেতারা এই ১৩টি পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে নিজ উদ্যোগে দ্রুত হস্তক্ষেপ করবেন?
লেখক পরিচিতি:
মো. শামীউল আলীম শাওন
এম.এ (বাংলা), বি.এ (অনার্স), পি.জি.ডি ইন আই.টি (রা.বি)
লেখক, উন্নয়ন ও অধিকারকর্মী (শ্রেষ্ঠ যুব সম্মাননাপ্রাপ্ত); প্রতিষ্ঠাতা-সভাপতি, ইয়ুথ এ্যাকশন ফর সোস্যাল চেঞ্জ (ইয়্যাস)।
অব্যাহতিপ্রাপ্ত দৈনিক মজুরিভিত্তিক পোস্টাল অপারেটর, ঘোড়ামারা প্রধান ডাকঘর, রাজশাহী।
ইমেইল: behrshamiul@gmail.com
শেয়ার করুন
বস্তনিষ্ঠ সংবাদের একমাত্র অনলাইন ঠিকানা