নাগরিকদের সীমাহীন ভোগান্তি
এনআইডি সংশোধন বন্ধ, ভোগান্তিতে নাগরিকরা
জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) সংশোধন করতে গিয়ে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন দেশের বিভিন্ন প্রান্তের নাগরিকরা। নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের এনআইডি অনুবিভাগের মহাপরিচালকের (ডিজি) দপ্তরে সংশোধনের আবেদন দীর্ঘদিন ধরে পড়ে থাকায় সময়মতো সেবা পাচ্ছেন না অনেকে। অভিযোগ রয়েছে, ২০২৫ সালের প্রায় দুই হাজার আবেদন এখনো নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে। এসব আবেদন প্রায় ৯ মাস ধরে ঝুলে থাকলেও কার্যকর অগ্রগতি নেই।
অভিযোগ রয়েছে, পুরোনো আবেদন নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত ২০২৬ সালে জমা দেওয়া অনেক আবেদনও সংশোধন করা হচ্ছে না। তবে এ বিষয়ে কোনো লিখিত প্রজ্ঞাপন বা অফিস আদেশ দেওয়া হয়নি। সংশ্লিষ্টদের দাবি, ডিজির দপ্তর থেকে মৌখিকভাবে আগের বছরের আবেদনগুলো আগে নিষ্পত্তির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এদিকে দীর্ঘদিন আবেদন ঝুলে থাকার সুযোগে একটি অসাধু চক্র সক্রিয় হয়ে উঠেছে বলেও অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা। তাদের দাবি, সাধারণ আবেদনকারীদের আবেদন মাসের পর মাস আটকে থাকলেও বিশেষ সুপারিশ কিংবা দালালের মাধ্যমে অতিরিক্ত অর্থের বিনিময়ে কিছু আবেদন দ্রুত নিষ্পত্তি করা হচ্ছে।
ঢাকার একটি বেসরকারি ব্যাংকের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট (এসভিপি) জাফর আহমেদ মজুমদার। সঞ্চয় ও ব্যাংকঋণের অর্থ দিয়ে সম্প্রতি একটি ফ্ল্যাট কেনার উদ্যোগ নেন তিনি। কিন্তু রেজিস্ট্রেশনের সময় দেখা যায়, তার এনআইডিতে নামের বানান ও জন্মতারিখে ভুল রয়েছে। ফলে ফ্ল্যাটটির রেজিস্ট্রেশন করতে পারেননি তিনি।
এনআইডি সংশোধনের জন্য চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে আবেদন করেন জাফর আহমেদ। কিন্তু এখনো সেই সংশোধন হয়নি। এর ফলে ফ্ল্যাটের রেজিস্ট্রেশনও আটকে আছে। এরই মধ্যে হাউজিং কোম্পানিকে বড় অঙ্কের অর্থ পরিশোধ করেছেন তিনি। শুরু হয়েছে ব্যাংকঋণের কিস্তিও। অথচ যে ফ্ল্যাট কেনার জন্য ঋণ নিয়েছেন, এনআইডি সংশোধন না হওয়ায় সেটির মালিকানা বুঝে নিতে পারছেন না।
কত দিনে এনআইডি সংশোধন হবে, সেটিও জানেন না জাফর আহমেদ। নিয়ম মেনে আবেদন করার পরও দীর্ঘদিন অপেক্ষা করতে হচ্ছে বলে হতাশা প্রকাশ করেন তিনি।
শুধু জাফর আহমেদ নন, এনআইডিতে ভুল সংশোধনের জন্য এমন ভোগান্তিতে রয়েছেন বহু নাগরিক। প্রয়োজনীয় কাজ বাদ দিয়ে অনেকে দিনের পর দিন নির্বাচন কমিশন কার্যালয়ে ঘুরছেন। অথচ একজন নাগরিকের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ প্রায় সব সেবার সঙ্গে এনআইডি যুক্ত থাকায় এর সংশোধন আটকে গেলে ভোগান্তি ছড়িয়ে পড়ছে অন্যান্য ক্ষেত্রেও।
পাসপোর্ট করা বা নবায়ন, ব্যাংক হিসাব খোলা ও লেনদেন, সিম নিবন্ধন, জমি ও ফ্ল্যাট রেজিস্ট্রেশন, ড্রাইভিং লাইসেন্স, টিআইএন ও করসংক্রান্ত কাজ, চাকরি, বিয়ে নিবন্ধন, সরকারি ভাতা, বীমা, শেয়ারবাজার এবং মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস)—এসব সরকারি-বেসরকারি সেবার ক্ষেত্রে এনআইডি গুরুত্বপূর্ণ নথি হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে করা প্রায় দুই হাজার এনআইডি সংশোধনের আবেদন এখনো ডিজির দপ্তরে নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে। প্রায় ৯ মাস ধরে এসব আবেদন পড়ে থাকলেও সেগুলোর নিষ্পত্তিতে দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই বলে অভিযোগ।
একই সঙ্গে ২০২৬ সালে জমা দেওয়া আবেদনগুলোও আগের বছরের আবেদন নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত সংশোধন করা হচ্ছে না বলে জানা গেছে। তবে চলতি বছরের আবেদনগুলো আটকে রাখার বিষয়ে কোনো লিখিত নির্দেশনা বা অফিস আদেশ নেই।
সংশ্লিষ্টরা জানান, ডিজির দপ্তর থেকে মৌখিকভাবে ২০২৫ সালের আবেদনগুলো আগে নিষ্পত্তির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এনআইডি সংশোধনের আবেদন দীর্ঘদিন ঝুলে থাকার সুযোগে দালালচক্র সক্রিয় হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন কয়েকজন সেবাপ্রার্থী। সংশোধনের ধরন ও জটিলতার ওপর ভিত্তি করে কথিত লেনদেনের পরিমাণ নির্ধারণ করা হয় বলেও দাবি তাদের।
তাদের অভিযোগ, কোনো কোনো ক্ষেত্রে এনআইডি সংশোধনের জন্য ২০ হাজার টাকা থেকে শুরু করে দুই-তিন লাখ টাকা পর্যন্ত চাওয়া হচ্ছে। শুধু বয়স সংশোধনের জন্য সর্বনিম্ন ১৫ হাজার টাকা, সম্পূর্ণ নাম পরিবর্তনের ক্ষেত্রে এক থেকে দেড় লাখ টাকা এবং বাবা-মায়ের নাম সম্পূর্ণ পরিবর্তনের ক্ষেত্রেও এক থেকে দেড় লাখ টাকা পর্যন্ত দাবি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
ভুক্তভোগীদের তথ্যমতে, কথিত এই চক্রে নির্বাচন কমিশনের কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী, আউটসোর্সিংয়ে নিয়োজিত অফিস সহকারী বা সহায়ক, আনসার সদস্য এবং বাইরের দালালদের একটি অংশ জড়িত।
শেখ মুরাদ এনপিবি নিউজকে বলেন, ‘আমি এমন একটি সমস্যা নিয়ে ঘুরছি যেটা আমার নিজের তৈরি করা সমস্যা নয়। এনআইডি তৈরিতে কর্মকর্তার ভুলবশত দেওয়া আমার জন্ম তারিখ ১০ দিন কমিয়ে দিয়েছেন। অথচ আমার পাসপোর্ট, জন্ম নিবন্ধন এবং ড্রাইভিং লাইসেন্সে একই জন্ম তারিখ দেওয়া। শুধু এনআইডিতে ১০ দিন কমানো। সেই সমস্যা সমাধানে আমি দেশে এসেই সংশোধনের আবেদন করেছি। এদিকে আমার ছুটি শেষ হয়ে যাচ্ছে পাশাপাশি পাসপোর্টের মেয়াদও প্রায় শেষ। কিন্তু আমার অপেক্ষা শেষ হচ্ছে না। এনআইডি সংশোধন না হওয়ায় পাসপোর্টও নবায়ন করা যাচ্ছে না।’
তিনি আরো বলেন, ‘সময় শেষ হয়ে আসায় এনআইডি অফিসের এক কর্মচারীর পরামর্শে এক দালালের সঙ্গে কথা হয়। তিনি খুব দ্রুত কাজ করে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে ৫০ হাজার টাকা দাবি করেন। এত টাকা দিয়ে এনআইডি সংশোধনে রাজি না হওয়ায় এখনো ঝুলেই আছে আমার কাজ। এখন বাধ্য হয়েই টাকা দিয়ে আমার কাজ করাতে হবে বলেই মনে হচ্ছে।’
সরেজমিনে নির্বাচন কমিশন অফিস ঘুরে দেখা যায়, এনআইডি সংশোধনের আবেদন নিয়ে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে ঢাকায় এসে দিনের পর দিন ঘুরছেন আবেদনকারীরা। কখনো সার্ভার কাজ করছে না, আবার কখনো অফিসার নেই বলে আর সংশোধন হচ্ছে না এনআইডি।
এসব বিষয়ে জানতে এনআইডির মহাপরিচালক আনোয়ার পাশার দপ্তরে একাধিকবার যায় এনপিবি নিউজ। কিন্তু একবারও তাকে পাওয়া যায়নি। পাশাপাশি তার ব্যক্তিগত নাম্বারে অসংখ্যবার ফোন করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। পরবর্তীতে তাকে হোয়াটসঅ্যাপে প্রশ্ন লিখে মেসেজ করলেও তিনি তার কোনো উত্তর দেননি। তাই তার বক্তব্য জানতে পারেনি এনপিবি নিউজ।
এ বিষয়ে জানতে সচিবের দপ্তরে যোগাযোগ করে এনপিবি নিউজ। সেখান থেকে জানানো হয়, এটি সম্পূর্ণভাবে ডিজির কার্যাধীন। এ বিষয়ে সচিবের কোনো বক্তব্য নেই।
নাগরিকদের এই ভোগান্তি সম্পর্কে জানতে চাইলে সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সভাপতি বদিউল আলম মজুমদার এনপিবি নিউজকে বলেন, ‘এনআইডিতে ভুল করেন সরকারি লোক, কিন্তু ভুগতে হয় সাধারণ নাগরিকদের। অথচ এখানে নাগরিকদের কোনো ভুল নেই। এই ভুল শোধরাতে আবার সরকার ফি নির্ধারণ করে দিয়েছে, যা আসলে জনগণকেই দিতে হয়। কিন্তু এই মাশুল তো জনগণের দেওয়ার কথা নয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘তবুও সেই জরিমানা দিয়েও কেউ সহজ উপায়ে এনআইডি সংশোধন করতে পারছেন না। সব জায়গায় দালাল ও দুর্নীতিবাজদের দৌরাত্ম্য। এসব বিষয়ে সরকারের উচিত আরও আন্তরিক হয়ে জনগণকে সঠিক সেবা দেওয়া।’
বস্তনিষ্ঠ সংবাদের একমাত্র অনলাইন ঠিকানা