ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে দখলের অভিযোগ

রাজশাহীর গোধুলি মার্কেটে প্রভাবশালীর দখলদারিত্বের অভিযোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশ : ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:২৪ পিএম আপডেট : ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০৫ এএম ১৯ বার পঠিত
রাজশাহীর গোধুলি মার্কেটে প্রভাবশালীর দখলদারিত্বের অভিযোগ

রাজশাহীর গোধুলি মার্কেটে প্রভাবশালীর দখলদারিত্বের অভিযোগ

সংবাদ ২৪ ঘন্টা
০৪ সেপ্টে ২০২৬
ভবনের মালিক রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (আরডিএ)। নাম গোধুলি মার্কেট। চারতলা ভবনের প্রতি তলায় আয়তন ২৩ হাজার ৬৪৩ বর্গফুট। এরমধ্যে চারতলায় ৪ হাজার ৫২৪ বর্গফুট জায়গাজুড়ে আলিশান এক ফ্ল্যাট বানিয়েছেন রাজশাহীর প্রভাবশালী ব্যবসায়ী শফিকুল আউয়াল খান। কয়েক বছর ধরে সেখানেই স্বপরিবারে বসবাস করছেন তিনি। শুধু তা-ই নয়, তিনি ভবনটির দোতলায় ১৫৭টি দোকানের স্থান দখল করে বানিয়েছেন একটি ফার্নিচারের শোরুম। এ জন্য দখল করেছেন ভবনের দোতলার প্যাসেজ ও ক্যান্ডিলিভারের জায়গা। এছাড়া চারতলায় আরও ৪ হাজার ৫৯০ বর্গফুট জায়গা দখল করে বানিয়েছেন একটি ফার্নিচারের গুদাম। নগরের শিরোইল বাস টার্মিনাল এলাকার এই ভবনটিকে নিজের মতো করেই ব্যবহার করছেন রাজশাহীর অন্যতম শীর্ষ এই ব্যবসায়ী। ভবনের যেটুকু স্পেশ তিনি আরডিএ থেকে ভাড়া নিয়েছেন, তারও ঠিকমত ভাড়া দেন না। আরডিএ বার বার চিঠি দিলেও টাকা আর ক্ষমতার দাপটে তিনি পাত্তা দেননি। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তাঁর কাছে অসহায় হয়ে থেকেছে আরডিএ। আরডিএ থেকে জানা গেছে, ২০০৭-০৮ সালে গোধুলি মার্কেট নির্মাণ করা হয়। এরপর ২০০৮ সালেই দোকান বরাদ্দ শুরু হয়। ভবনের নিচতলার দোকানগুলো খাবারের হোটেল ও বিভিন্ন বাসের টিকিট কাউন্টার হিসেবে ভাড়া দেওয়া হয়। দোতলায় ছিল ১৫৭টি দোকান। এরমধ্যে ৪৬টি দোকান মিলে ৫ হাজার ৬১২ বর্গফুট জায়গা ভাড়া নেন ব্যবসায়ী শফিকুল আউয়াল খান। এর পাশাপাশি তিনি আরও ১ হাজার বর্গফুট জায়গা ভাড়া নেন। আরডিএর আরও শতাধিক দোকানের ভাড়াটিয়ার কাছ থেকেও তিনি তাদের দোকানগুলো নিয়ে নেন। এখান থেকে জায়গা পান আরও ৪ হাজার ৩০৭ বর্গফুট। এই সব দোকান ভেঙে তিনি বানিয়েছেন একটি ফার্নিচারের শোরুম। এখন ১৫৭টি দোকানের কোনো অস্তিত্ব নেই। আরডিএ বলছে, ভবনের দোতলায় শুধু দোকান থাকার কথা। সেটি কোনো বাণিজ্যিক স্পেশ নয়। অথচ ১৫৭টি দোকান ভেঙে আরডিএর অনুমোদন ছাড়াই বাণিজ্যিক স্পেশ করেছেন শফিকুল। ভবনের ডিজাইন অনুযায়ী, দোতলার ১৫৭টি দোকান ছিল কয়েকটি সারিতে। এসব দোকানে চলাচলের জন্য ৫ হাজার ৭৬৯ বর্গফুট জায়গাজুড়ে ছিল প্যাসেজ এবং ক্যান্ডিলিভার। নিজের ফার্নিচারের সুবিশাল একটি শোরুম বানাতে এর সবই দখল করেছেন শফিকুল। দোতলায় তিনি মোট ১৬ হাজার ৬৮৯ বর্গফুট জায়গা ব্যবহার করছেন। অবরুদ্ধ তৃতীয় তলা ডিজাইনে ভবনের তৃতীয় তলা বাণিজ্যিক স্পেশ। বাস্তবেও তা রয়েছে। কিন্তু তৃতীয় তলার ভাড়াটিয়ারা অনেকটা অবরুদ্ধ অবস্থায় পড়েছেন দোতলায় শফিকুলের শোরুমের কারণে। দোতলায় প্যাসেজ ও ক্যান্ডিলিভার দখল করে নেওয়ায় তৃতীয় তলায় যেতে হয় শোরুমের ভেতর দিয়ে। গত মঙ্গলবার ভবনের তৃতীয় তলায় গিয়ে দেখা যায়, সেখানে একটি ব্যাংকের শাখাসহ কয়েকটি আইটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। একজন ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে বলেন, ডিজাইন পরিবর্তন করে দোতলা দখল করে নেওয়ায় তাদের খুব সমস্যা। তারা অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন। তাদের ব্যবসা-বাণিজ্য হয় না। বিষয়টি তারা আরডিএকে জানিয়েছেন। রয়েছে আলিশান ফ্ল্যাট আরডিএ সূত্রে জানা গেছে, ২০১২ সালে চতুর্থ তলায় কাজ শুরু হয়। ডেভেলপার হিসেবে চারতলার কাজ পান শফিকুল আউয়াল খান। কিন্তু কাজে ব্যাপক অনিয়ম শুরু করেন তিনি। তখন তাকে কাজ বন্ধ করার নির্দেশ দেয় আরডিএ। এর বিরুদ্ধে হাইকোর্টে রিট করেন শফিকুল। এরপর কাজ পুরোপুরিই বন্ধ থাকার কথা। কিন্তু আরডিএর অগোচরেই চারতলায় ৪ হাজার ৫২৪ বর্গফুট জায়গাজুড়ে আলিশান এক ফ্ল্যাট নির্মাণ করে নেন শফিকুল। এখন সেখানে স্বপরিবারে বসবাস করছেন তিনি। পাশাপাশি আরও ৪ হাজার ৫৯০ বর্গফুট জায়গা দখল করে বানিয়েছেন ফার্নিচারের গুদাম। এসবের জন্য আরডিএকে এক টাকাও ভাড়া দেন না তিনি। শফিকুল আউয়াল খানের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের নাম খান ফার্নিচার গ্যালারি। তিনি হাতিম, হাতিল ও ব্রাদার্স ফার্নিচারের পরিবেশক। অভিযোগ রয়েছে, চারতলার ওই গুদামে নিম্নমানের নকল ফার্নিচার তৈরি করে নামিদামি ব্র্যান্ডের স্টিকার লাগিয়ে শোরুমে বিক্রি করা হয়। গত মঙ্গলবার সকালে গিয়ে দেখা যায়, চারতলায় ঢোকার মুখে সিঁড়ির সঙ্গে একটি কলাপশিবল গেট। সেটিতে তালা দেওয়া। তাই গুদাম ও ফ্ল্যাটে বাইরের কেউ যেতে পারে না। ফ্ল্যাটের ভেতরের একটি ভিডিওতে দেখা যায়, সুবিশাল আয়তনের ফ্ল্যাটটি দামি দামি সব আসবাবপত্রে সজ্জিত। এই অবৈধ নির্মাণের বিষয়টি জানতে পেরে ২০১৯ সালের ১৮ নভেম্বর উচ্ছেদ অভিযানে যায় আরডিএ। শফিকুল তখন তার হাইকোর্টের রিটের কাগজ বের করে দেখান। তাই উচ্ছেদ করতে পারেনি আরডিএ। এখন নিশ্চিন্তেই পরিবার নিয়ে মার্কেটে বাস করছেন তিনি। অসহায় আরডিএ শফিকুল আউয়াল খান চারতলায় অবৈধভাবে মোট ৯ হাজার ১১৪ বর্গফুট জায়গা ব্যবহার করছেন। আর দোতলায় শোরুমের জন্য অবৈধভাবে দখলে রেখেছেন আরও ১০ হাজার ৭৬ বর্গফুট জায়গা। শুধু দোতলায় ৬ হাজার ৬১২ বর্গফুট জায়গা বৈধভাবে ভাড়া নিয়েছেন তিনি। এই জায়গারও ঠিকমতো ভাড়া পরিশোধ করেন না প্রভাবশালী এই ব্যবসায়ী। আরডিএ সূত্রে জানা গেছে, ২০০৮ সালে ভবনের প্রতি বর্গফুটের জন্য ভাড়া নির্ধারণ করা হয় সাড়ে ৩ টাকা। সে হিসেবে তিনি ব্যাংকে মাত্র ২৩ হাজার ১৪২ টাকা ভাড়া দেন। তাও বিপুল টাকা বকেয়া পড়েছে। পরবর্তী সময়ে ভাড়া বাড়লেও তাতে পাত্তা দেননি শফিকুল। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, ২০১৬ সালে ভবনের ভাড়া প্রতি বর্গফুটের জন্য ৫ টাকা নির্ধারণ হয়েছে। এর প্রতি তিন বছর পর পর স্বয়ংক্রিয়ভাবে ১০ শতাংশ করে ভাড়া বেড়েছে। কিন্তু সেসবে কান না দিয়ে আগের সাড়ে ৩ টাকা করেই কিছু দিন ভাড়া পরিশোধ করেন শফিকুল। এ অবস্থায় বকেয়াসহ নতুন ভাড়া অনুযায়ী টাকা পরিশোধে ২০১৩, ২০১৪, ২০১৬ ও ২০২০ সালে শফিকুলকে চিঠি দিয়েছে আরডিএ। কিন্তু তাতেও কোনো সাড়া দেননি তিনি। সংশ্লিষ্টরা যা বলছেন শফিকুল আউয়াল খানের সঙ্গে কথা বলতে মঙ্গলবার শোরুমে গেলে তাকে পাওয়া যায়নি। মো. সাঈদ নামের এক কর্মকর্তা এ বিষয়ে কথা বলতে চাননি। শোরুমে ছিলেন শফিকুলের ভাতিজা উলগান হাসান খান। এই প্রতিবেদককে কে পাঠিয়েছে, তিনি বার বার তা জানতে চান। মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করে দোতলায় ১৫৭ দোকান ভেঙে বাণিজ্যিক স্পেশ নির্মাণের বিষয়ে জানতে চাইলে শফিকুল আউয়াল খান দাবি করেন, তিনি ভাড়া নেওয়ার সময় সেখানে দোকান ছিল না। চারতলার ফ্ল্যাটের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমি ডেভেলপার। আমি যা খুশি তা-ই করতে পারি। মেস, হোস্টেল, বাসাও কমার্সিয়াল স্পেশ। এটা করেও ভাড়া দেওয়া যায়।’ অবৈধ গুদামের বিষয়েও তিনি একই দাবি করেন। দোতলায় ক্যান্ডিলিভার ও প্যাসাজ দখলের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘দখল কই? ওই জায়গায় তো কাস্টমাররা হাঁটেই।’ আরডিএর চেয়ারম্যান আবুল কালাম আজাদ সুইট বলেন, ‘আরডিএর ভবনটিকে নিজের ইচ্ছেমতো ব্যবহার করছেন শফিকুল আউয়াল খান। তিনি অনুমোদন ছাড়া ডিজাইন পরিবর্তন করেছেন। এমনকি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট বানিয়ে পরিবার নিয়েও বসবাস করছেন। এতদিন আওয়ামী লীগের ক্ষমতার দাপটে আরডিএ তার কাছে অসহায় ছিল। কিছুই করতে পারেনি।’ তবে অচিরেই উচ্ছেদ অভিযান পরিচালিত হবে বলে জানান আরডিএ চেয়ারম্যান আবুল কালাম আজাদ সুইট। তিনি বলেন, শফিকুল আউয়াল খান যেটুকু বৈধভাবে ভাড়া নিয়েছেন সেটুকুর পাওনা বকেয়া ভাড়া আদায় করা হবে। ভবনটিকে আগের ডিজাইনে ফিরিয়ে আনা হবে। পাশাপাশি অবৈধভাবে অতিরিক্ত জায়গা ব্যবহারের জন্য জরিমানা আদায় করা হবে। এ জন্য নানামুখী বাধা আসছে। অনৈতিক প্রস্তাবও দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু এসব পাত্তা না দিয়ে তিনি গোধুলি মার্কেটকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিয়েছেন।

সম্পর্কিত নিউজ

অ্যাপ ইনস্টল করুন

এই নিউজ পোর্টালটি মোবাইল অ্যাপের মতো ব্যবহার করুন।