তথ্যনির্ভর সাংবাদিকতা নিয়ে বাড়ছে প্রশ্ন

তেলবাজির হিড়িকে প্রশ্নের মুখে বাংলাদেশের গণমাধ্যম

সংবাদ ২৪ ঘন্টা প্রকাশ : ০৮ আগস্ট ২০২৬, ০১:৫২ পিএম আপডেট : ০৮ আগস্ট ২০২৬, ০৭:০৪ পিএম ১২ বার পঠিত
তেলবাজির হিড়িকে প্রশ্নের মুখে বাংলাদেশের গণমাধ্যম

তেলবাজির হিড়িকে প্রশ্নের মুখে বাংলাদেশের গণমাধ্যম

সংবাদ ২৪ ঘন্টা
০৮ আগ ২০২৬
বাংলাদেশের গণমাধ্যম নিয়ে কথা বলতে গেলে আজ একটি অস্বস্তিকর বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়। সাংবাদিকতার মূল দায়িত্ব যেখানে সত্য অনুসন্ধান, জনস্বার্থ রক্ষা এবং ক্ষমতাকে জবাবদিহির আওতায় আনা, সেখানে অনেক ক্ষেত্রে সংবাদ পরিবেশনের ধরন দেখে মনে হচ্ছে—কিছু সংবাদমাধ্যম সংবাদ প্রকাশের পাশাপাশি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের প্রচারণার দায়িত্বও কাঁধে তুলে নিয়েছে। কোনো ব্যক্তি পদে বসেছেন, কোনো কর্মকর্তা নতুন দায়িত্ব পেয়েছেন, কোনো রাজনৈতিক নেতা এলাকায় গেছেন, কোনো ব্যবসায়ী একটি কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছেন কিংবা কোনো প্রতিষ্ঠান সামান্য একটি উদ্যোগ নিয়েছে—এসব ঘটনাকে ঘিরে একের পর এক প্রশংসামূলক সংবাদ প্রকাশিত হচ্ছে। সংবাদে তথ্যের চেয়ে বিশেষণ বেশি, ঘটনার চেয়ে প্রশংসা বেশি, আর মানুষের প্রয়োজনের চেয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ভাবমূর্তি তৈরির বিষয়টি অনেক সময় বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। প্রশ্ন হলো, সাংবাদিকতা কি এখন মানুষের জানার অধিকার পূরণের জায়গা, নাকি প্রভাবশালীদের দৃশ্যমানতা বাড়ানোর মাধ্যম? একজন সরকারি কর্মকর্তা দায়িত্ব পালন করবেন—এটাই স্বাভাবিক। একজন জনপ্রতিনিধি জনগণের জন্য কাজ করবেন—এটাই তাঁর দায়িত্ব। একজন পুলিশ কর্মকর্তা আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করবেন—এটিই তাঁর পেশাগত কর্তব্য। একজন চিকিৎসক রোগী দেখবেন, একজন শিক্ষক শিক্ষার্থীদের পড়াবেন, একজন প্রকৌশলী উন্নয়নকাজ দেখবেন—প্রত্যেকেই নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করবেন। এসব কাজের মধ্যে যদি অসাধারণ কোনো ঘটনা থাকে, জনস্বার্থে তার সংবাদ হওয়া অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু নিয়মিত দায়িত্ব পালনের প্রতিটি ঘটনাকে ব্যক্তিগত কৃতিত্ব হিসেবে তুলে ধরে সংবাদ বানানোর প্রবণতা সাংবাদিকতার নিরপেক্ষতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, অনেক সময় একই ব্যক্তিকে নিয়ে ধারাবাহিক প্রশংসামূলক সংবাদ প্রকাশিত হয়। সেখানে থাকে ‘জনবান্ধব’, ‘দক্ষ’, ‘সৎ’, ‘জনপ্রিয়’, ‘মানবিক’, ‘সফল’—এমন নানা বিশেষণ। কিন্তু এসব বিশেষণের পেছনে তথ্য কোথায়? কতজন মানুষের বক্তব্য নেওয়া হয়েছে? কোনো স্বাধীন সূত্র কি বিষয়টি নিশ্চিত করেছে? সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির কাজের ইতিবাচক ও নেতিবাচক—দুই দিকই কি যাচাই করা হয়েছে? সংবাদ যদি শুধু এক পক্ষের বক্তব্য বহন করে, তাহলে সেটি পূর্ণাঙ্গ সংবাদ থাকে না। গণমাধ্যমের সবচেয়ে বড় শক্তি তার বিশ্বাসযোগ্যতা। একটি সংবাদমাধ্যম পাঠকের কাছে গ্রহণযোগ্য হয় তখনই, যখন পাঠক বিশ্বাস করেন—এই সংবাদে কোনো ব্যক্তিগত স্বার্থ কাজ করছে না। কিন্তু সংবাদ যখন কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের প্রতি অতিরিক্ত আনুগত্যের চিত্র তৈরি করে, তখন পাঠকের মনে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জন্ম নেয়—এটি কি সংবাদ, নাকি প্রচারণা? এই প্রশ্নটি শুধু সাংবাদিকদের জন্য নয়; সম্পাদক, প্রকাশক এবং সংবাদমাধ্যমের মালিকদের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। একটি সংবাদমাধ্যমের দায়িত্ব শুধু বড় মানুষের খবর প্রকাশ করা নয়। যে কৃষক প্রতিদিন মাঠে কাজ করছেন, যে শ্রমিক অল্প মজুরিতে পরিবার চালাচ্ছেন, যে শিক্ষক প্রত্যন্ত এলাকায় শিক্ষার আলো ছড়াচ্ছেন, যে নারী নিজের উদ্যোগে পরিবারকে দাঁড় করাচ্ছেন, যে তরুণ কর্মসংস্থানের জন্য সংগ্রাম করছেন—তাঁদের কথাও সংবাদ। যে মানুষ অন্যায়ের শিকার হয়েছেন, তাঁর বক্তব্যও সংবাদ। যে সরকারি সেবা থেকে সাধারণ মানুষ বঞ্চিত হচ্ছেন, সেটিও সংবাদ। যে প্রকল্পে অর্থ ব্যয় হচ্ছে কিন্তু কাজ হচ্ছে না, সেটিও সংবাদ। অথচ এসব কঠিন ও অনুসন্ধানী বিষয় বাদ দিয়ে সহজ পথে প্রশংসার সংবাদ তৈরি করা অনেক বেশি সুবিধাজনক। কারণ প্রশংসামূলক সংবাদে প্রশ্ন করতে হয় না, নথি খুঁজতে হয় না, তথ্য যাচাই করতে হয় না, ক্ষমতাবানদের অস্বস্তিতে ফেলতে হয় না। কিন্তু সাংবাদিকতার সৌন্দর্য তো এখানেই নয়। সাংবাদিকতা কোনো ব্যক্তির সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখার পেশা নয়। সাংবাদিকতা সত্যের সঙ্গে সম্পর্ক রাখার পেশা। একজন সাংবাদিকের কাছে ক্ষমতাবান ও সাধারণ মানুষের মর্যাদা সমান হওয়া উচিত। তিনি যেমন একজন জনপ্রতিনিধির ভালো কাজ প্রকাশ করবেন, তেমনি তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট অভিযোগও অনুসন্ধান করবেন। একজন পুলিশ কর্মকর্তার ভালো কাজ তুলে ধরবেন, আবার পুলিশের কোনো অনিয়মের অভিযোগ থাকলে সেটিও যাচাই করে প্রকাশ করবেন এটাই পেশাদারিত্ব। বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তারের কারণে সংবাদ ও প্রচারণার সীমারেখা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। একটি প্রশংসামূলক লেখা মুহূর্তের মধ্যে হাজারো মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। ফলে সংবাদমাধ্যমের প্রতিটি শব্দের দায়িত্বও বেড়েছে। সংবাদে অতিরঞ্জন থাকলে, ভুল তথ্য থাকলে কিংবা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রশংসা থাকলে তার প্রভাবও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। সবচেয়ে ভয়ংকর পরিস্থিতি তৈরি হয় তখন, যখন কোনো সংবাদমাধ্যমের সাংবাদিক বা প্রতিনিধির সঙ্গে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ঘনিষ্ঠতার কারণে সংবাদ নির্বাচনের ক্ষেত্রে পক্ষপাত তৈরি হয়। তখন খবর হয় পরিচিতদের নিয়ে, আর বাদ পড়ে যায় যাঁদের কথা সত্যিই মানুষের জানা প্রয়োজন। এমন বাস্তবতা গণমাধ্যমের জন্য সুখকর নয়। গণমাধ্যমকে কারও শত্রু হওয়ার প্রয়োজন নেই। আবার কারও তোষামোদ করারও প্রয়োজন নেই। গণমাধ্যমের অবস্থান হওয়া উচিত সত্যের পাশে। কোনো ভালো কাজের প্রশংসা করতে হলে তথ্য দিয়ে করতে হবে। কোনো অভিযোগ প্রকাশ করতে হলে প্রমাণ ও সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য নিতে হবে। কোনো ব্যক্তিকে সফল বলতে হলে তাঁর সাফল্যের বাস্তব উদাহরণ দিতে হবে। কোনো কর্মকর্তাকে জনবান্ধব বলতে হলে জনগণের অভিজ্ঞতা তুলে ধরতে হবে। শুধু বিশেষণ দিয়ে সাংবাদিকতা হয় না। আজ বাংলাদেশের গণমাধ্যমের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—আমরা কি সংবাদকে সংবাদ হিসেবে রাখছি, নাকি ধীরে ধীরে সংবাদকে প্রচারণায় পরিণত করছি? এই প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। কারণ গণমাধ্যমের স্বাধীনতা শুধু সংবাদ প্রকাশের স্বাধীনতা নয়; এটি সত্য প্রকাশের দায়িত্বও। স্বাধীনতার সঙ্গে দায়িত্ব না থাকলে সংবাদমাধ্যমের শক্তি মানুষের আস্থার বদলে বিভ্রান্তির কারণ হতে পারে। গণমাধ্যমের সামনে এখন দুটি পথ—একটি সহজ, অন্যটি কঠিন। সহজ পথ হলো ক্ষমতাবানকে খুশি করা, প্রশংসা প্রকাশ করা এবং সম্পর্ক অটুট রাখা। কঠিন পথ হলো প্রশ্ন করা, তথ্য যাচাই করা, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো এবং প্রয়োজন হলে নিজের পরিচিত মানুষকেও সমালোচনার আওতায় আনা। ইতিহাস সবসময় কঠিন পথের সাংবাদিকতাকেই মনে রাখে। তাই এখনই সময় সংবাদমাধ্যমের ভেতরে নিজেদের প্রশ্ন করার—আমরা কার জন্য লিখছি? কার কথা বলছি? কার স্বার্থ রক্ষা করছি? আমাদের প্রতিবেদনে মানুষের অধিকার কতটা আছে? একজন সাংবাদিকের কলমের মূল্য তার প্রশংসায় নয়, তার সত্য বলার সাহসে। গণমাধ্যম যদি সত্যিই রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ হয়ে থাকতে চায়, তাহলে তাকে তেলবাজির সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতেই হবে। সংবাদে ফিরিয়ে আনতে হবে তথ্য, অনুসন্ধান, প্রশ্ন এবং জনস্বার্থ। কারও পদবি বড় বলে সংবাদ বড় হবে না; মানুষের স্বার্থে তার কাজ কতটা গুরুত্বপূর্ণ—সেটিই সংবাদ হওয়ার প্রধান কারণ। গণমাধ্যম কারও ব্যক্তিগত প্রচারণার মঞ্চ নয়। এটি জনগণের আয়না। আর আয়না যদি সত্য দেখাতে ভয় পায়, তাহলে সেই আয়নার প্রয়োজনই বা কী? আজ প্রয়োজন এমন সাংবাদিকতার, যেখানে প্রশংসা থাকবে কাজের জন্য, সমালোচনা থাকবে অন্যায়ের বিরুদ্ধে, আর সংবাদ থাকবে মানুষের জন্য। তেলবাজির হিড়িক থামুক। সংবাদ ফিরে আসুক সংবাদে। গণমাধ্যম ফিরে পাক তার বিবেক, সাহস ও মানুষের আস্থা।

সম্পর্কিত নিউজ

অ্যাপ ইনস্টল করুন

এই নিউজ পোর্টালটি মোবাইল অ্যাপের মতো ব্যবহার করুন।