গ্রীন সিটিতে বেপরোয়া বাইকারদের দাপট: আড়ালে মাদক ও ছিনতাইয়ের অন্ধকার

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশ : ২৩ জুন ২০২৬, ০৭:০১ পিএম আপডেট : ২৪ জুন ২০২৬, ০১:৪৩ পিএম ৪৫ বার পঠিত
গ্রীন সিটিতে বেপরোয়া বাইকারদের দাপট: আড়ালে মাদক ও ছিনতাইয়ের অন্ধকার

গ্রীন সিটিতে বেপরোয়া বাইকারদের দাপট: আড়ালে মাদক ও ছিনতাইয়ের অন্ধকার

সংবাদ ২৪ ঘন্টা
২৩ জুন ২০২৬
রাজশাহী মহানগরীকে দেশের সবচেয়ে সুন্দর, পরিচ্ছন্ন ও সবুজ শহর হিসেবে গণ্য করা হয়। দূর-দূরান্ত থেকে আসা পর্যটকরা এ শহরের চওড়া রাস্তা আর চমৎকার পরিবেশের ভূয়সী প্রশংসা করেন। কিন্তু এই নান্দনিক সৌন্দর্যের আড়ালে এখন এক চরম আতঙ্ক ও বিশৃঙ্খলার নাম ‘বেপরোয়া বাইক কালচার’। মহানগরীর বেশ কিছু নির্দিষ্ট স্পটে দিন-রাত ২৪ ঘণ্টাই বসে বখাটে মোটরসাইকেল আরোহীদের বিপজ্জনক আসর। এদের লাগামহীন গতি আর সাইলেন্সার পাইপ মডিফাই করে তৈরি করা বিকট শব্দে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে নগরবাসী। বিশেষ করে বিমান চত্বর, বহরমপুর ১২ রাস্তা মোড়, বুধপাড়া ফ্লাইওভার, মেহেরচণ্ডী ফ্লাইওভার এবং তালাইমারী থেকে ভদ্রা হয়ে বিহাস পর্যন্ত প্রধান সড়কগুলোতে এদের আনাগোনা সবচেয়ে বেশি। এসব এলাকায় তারা দলবেঁধে মোটরসাইকেল নিয়ে মহড়া দেয় এবং রেসিং স্টাইলে গাড়ি চালায়। আবার তালাইমারী থেকে বিহাস পর্যন্ত মহাসড়কে উল্টো পথে বা রাস্তার বাম দিক ঘেঁষে প্রচণ্ড গতিতে বাইক চালানো এখন নিত্যদিনের চিত্র। এর ফলে ফুটপাত দিয়ে সাধারণ মানুষের হাঁটাচলা করা কিংবা রাস্তা পারাপার হওয়া মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এই বেপরোয়া গতির কারণে প্রায়ই ঘটছে ছোট-বড় দুর্ঘটনা, এমনকি ঝরে যাচ্ছে তাজা প্রাণ। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, ট্রাফিক বিভাগের একশ্রেণীর কর্মকর্তাদের ভূমিকা নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক পথচারী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, প্রশাসন শুধু সাধারণ ও নিরীহ চালকদের ধরপাকড় এবং হয়রানি করে। অথচ যারা বুক ফুলিয়ে আইন অমান্য করছে, সেই ‘অসাধারণ’ বা প্রভাবশালী চক্রের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। একজন সাধারণ মোটরসাইকেল চালক নিজের তিক্ত অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে বলেন, তার চোখের সামনে দিয়ে ৩-৪ জন তরুণ বেপরোয়া গতিতে বাইক রেসিং করে চলে গেল, কিন্তু পুলিশ তাদের কিছুই বলল না। অথচ তার নিজের হেলমেটটি চুরি হয়ে যাওয়ার কারণে মাথায় হেলমেট ছিল না বলে সার্জেন্ট তাকে তিন হাজার টাকার মোটা অঙ্কের মামলা দিয়ে দিলেন। এই দ্বিমুখী নীতির কারণে সাধারণ মানুষের মনে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার প্রতি অনাস্থা তৈরি হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পুরোপুরি কঠোর হতে না পারায় অতিষ্ঠ হয়ে সাধারণ জনগণই এখন আইন নিজের হাতে তুলে নিতে বাধ্য হচ্ছে। কিছুদিন আগেই বুধপাড়া ফ্লাইওভার ও মেহেরচণ্ডী ফ্লাইওভারে তীব্র গতিতে বাইক চালানোর সময় সাধারণ মানুষ একদল বখাটে বাইকারের পথ রোধ করে। ক্ষিপ্ত জনতা তাদের গণধোলাই দেয়। পরে খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে এবং তাদের উদ্ধার করে নিয়ে যায়। সিটি বাইপাস রোডেও এই ধরনের বিশৃঙ্খল বাইকারদের উৎপাত দিন দিন লাগামহীন হয়ে উঠছে। বাইরে থেকে এদের পোশাক-আশাক এবং দামী দামী মোটরসাইকেল দেখে মনে হতে পারে এরা কোনো উচ্চবিত্ত বা ধনাঢ্য পরিবারের সন্তান। কিন্তু এদের ভেতরের আসল খবর বা পারিবারিক পরিচয় অনুসন্ধান করলে যে কারও চোখ কপালে উঠে যাবে। সম্প্রতি পার্শ্ববর্তী জেলা নাটোরের গ্রিনভ্যালি পার্কে বেড়াতে আসা পর্যটকদের হেনস্থা করার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে দেখা যায়, একদল বখাটে টিকটকার এক সাধারণ পর্যটককে ঘিরে ধরে চরম অপদস্থ করছে। ওই ভিডিওতে থাকা যুবকদের পোশাক ও আধুনিক চালচলন দেখে বোঝার উপায় ছিল না তারা কোন পরিবারের সন্তান। তবে পরবর্তীতে অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। ওই চক্রের মূল হোতার মা রাজশাহী মহানগরীর ভদ্রা বস্তিতে থাকেন এবং অন্যের বাড়িতে পরিচারিকার কাজ করেন, আর তার বাবা ভাঙাড়ির মালামাল কুড়িয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন। সংবাদ ২৪ ঘন্টার অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, এই বখাটেদের অনেকেরই পারিবারিক অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয়। এরা অনেকেই শহরের বিভিন্ন বস্তি বা নিম্নবিত্ত এলাকায় বসবাস করে। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, বিশেষ করে ‘টিকটক’ এর আড়ালে এরা গড়ে তুলেছে অপরাধের এক বিশাল সাম্রাজ্য। টিকটক ভিডিওর ভিউ আর সস্তা জনপ্রিয়তার নেশায় এরা একদিকে যেমন রাস্তায় মরণখেলায় মেতে উঠছে, অন্যদিকে এই খরুচে লাইফস্টাইল বজায় রাখার জন্য জড়িয়ে পড়ছে নানাবিধ অপরাধে। এই চক্রটির মূল উপার্জনের উৎস হলো ছিনতাই, মাদক ব্যবসা এবং মাদক সেবন। রাতের অন্ধকারে এরা একাকী কোনো পথচারীকে পেলেই ধারালো অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে মোবাইল, টাকা-পয়সা ও মূল্যবান সামগ্রী ছিনিয়ে নেয়। এদের উৎপাত ও আতঙ্কের কারণে এখন রাতের বেলা জরুরি প্রয়োজনেও মানুষ বাড়ি থেকে বের হতে ভয় পাচ্ছে। এই ছিনতাইকারী ও কিশোর গ্যাং চক্রের সদস্যদের চালচলন ও আধুনিক লেবাস দেখে চট করে বোঝার উপায় নেই যে এরা আসলে অপরাধ জগতের অন্ধকার সদস্য। রাজশাহী মহানগরীর একজন প্রবীণ বাসিন্দা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে সংবাদ ২৪ ঘন্টা প্রতিবেদকে বলেন, আমাদের এই শান্ত ও সুন্দর নগরীটি এখন সৌন্দর্যের আড়ালে প্রায় ধ্বংসের পথে চলে যাচ্ছে। তরুণ সমাজের এই নৈতিক অবক্ষয় এবং অপরাধপ্রবণতা যদি এখনই কঠোরহস্তে দমন করা না যায়, তবে গ্রীন সিটি ও ক্লিন সিটির সুনাম অচিরেই ধূলিসাৎ হয়ে যাবে। নগরবাসী মনে করেন, শুধু নামমাত্র জরিমানা বা মামলা দিয়ে এই চক্রকে থামানো সম্ভব নয়। এদের মূল উৎপাটন করতে হলে ট্রাফিক পুলিশ ও থানা পুলিশকে যৌথভাবে নিয়মিত চিরুনি অভিযান পরিচালনা করতে হবে। একই সাথে টিকটকের নামে যারা পর্যটন কেন্দ্র ও পাবলিক প্লেসে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে, তাদের চিহ্নিত করে দ্রুত আইনের আওতায় আনা জরুরি।

সম্পর্কিত নিউজ

অ্যাপ ইনস্টল করুন

এই নিউজ পোর্টালটি মোবাইল অ্যাপের মতো ব্যবহার করুন।