রাজশাহী নগরীর অটোরিকশা অরাজকতা: প্রশাসনের নীরবতায় জিম্মি সাধারণ যাত্রী

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশ : ২০ জুন ২০২৬, ১০:০৩ এএম আপডেট : ২০ জুন ২০২৬, ০১:০১ পিএম ৬ বার পঠিত
রাজশাহী নগরীর অটোরিকশা অরাজকতা: প্রশাসনের নীরবতায় জিম্মি সাধারণ যাত্রী

রাজশাহী নগরীর অটোরিকশা অরাজকতা: প্রশাসনের নীরবতায় জিম্মি সাধারণ যাত্রী

সংবাদ ২৪ ঘন্টা
২০ জুন ২০২৬
রাজশাহী মহানগরীর যাতায়াত ব্যবস্থায় অটোরিকশা চালকদের স্বেচ্ছাচারিতা ও অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের দৌরাত্ম্য এখন চরম সীমায় পৌঁছেছে। নগরীর প্রতিটি মোড়ে, বিশেষ করে রেলওয়ে স্টেশন ও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে চালকদের একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট সাধারণ যাত্রীদের জিম্মি করে নিজেদের ইচ্ছেমতো ভাড়া আদায় করছে। সরকার নির্ধারিত ভাড়ার কোনো তোয়াক্কা না করে চালকরা এখন যেন নিজেদের আইনের ঊর্ধ্বে মনে করছেন। দিনের পর দিন চলে আসা এই অরাজকতায় অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছেন নগরবাসী, অথচ কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ রয়েছে রহস্যজনকভাবে নীরব। বৃষ্টি, দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া কিংবা গভীর রাত—এই সুযোগগুলো অটোরিকশা চালকদের জন্য যেন বাড়তি আয়ের উৎসব। সাধারণ যাত্রীরা গন্তব্যে পৌঁছানোর জন্য যখন অসহায় বোধ করেন, ঠিক তখনই চালকরা স্বাভাবিক ভাড়ার চেয়ে দ্বিগুণ, তিনগুণ কিংবা তারও বেশি অর্থ দাবি করে বসেন। দূরপাল্লার ট্রেন থেকে নামা যাত্রী কিংবা বাইরের জেলা থেকে চিকিৎসা বা জরুরি প্রয়োজনে আসা সাধারণ মানুষ এই চাঁদাবাজির প্রধান শিকারে পরিণত হচ্ছেন। কোনো যাত্রী যদি ভাড়ার বিষয়ে প্রতিবাদ করেন কিংবা সরকারি ভাড়ার তালিকার কথা উল্লেখ করেন, তবে চালকদের রূঢ় আচরণ ও হেনস্তার শিকার হতে হয় অহরহ। তাদের এই বেপরোয়া আচরণের কারণে নগরীর সড়কে প্রায়শই বিবাদের সৃষ্টি হচ্ছে। এই পরিস্থিতির মূল কারণ হিসেবে রাজশাহী সিটি করপোরেশনের (রাসিক) প্রশাসনিক তদারকির অভাবকে দায়ী করছেন ভুক্তভোগীরা। অভিযোগ রয়েছে, নগরীতে অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণের জন্য কোনো কার্যকর মনিটরিং ব্যবস্থা নেই। নির্ধারিত ভাড়ার তালিকা থাকলেও তা কার্যকর করতে সিটি কর্তৃপক্ষের কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ চোখে পড়ে না। গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোতে ভাড়ার তালিকা টাঙানো বা তা নিয়মিত তদারকি করার কথা থাকলেও বাস্তবে তার কোনো প্রয়োগ নেই। প্রশাসন ও সিটি করপোরেশনের এই শৈথিল্যকে চালকরা তাদের ‘লাইসেন্স’ হিসেবে ধরে নিয়েছেন। ফলে তারা দিনের পর দিন আরও বেশি সাহসী ও বেপরোয়া হয়ে উঠছেন। নগরীর সচেতন মহল মনে করছেন, অটোরিকশা সেক্টরটিকে একটি পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনার আওতায় আনা এখন সময়ের দাবি। তারা বলছেন, রাজশাহী সিটি করপোরেশনকে অবিলম্বে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—নগরীর প্রতিটি মোড়ে ও গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ভাড়ার চার্ট বাধ্যতামূলকভাবে প্রদর্শন নিশ্চিত করা। এছাড়া অতিরিক্ত ভাড়া আদায়কারীদের চিহ্নিত করতে সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা জরুরি। অটোরিকশা চালকদের দৌরাত্ম্য নিয়ে সাধারণ যাত্রীরা যাতে তাৎক্ষণিক অভিযোগ জানাতে পারেন, এমন একটি কার্যকর ‘হটলাইন’ নম্বর চালু করা এবং প্রতিটি চালকের নিবন্ধন ও তথ্যভাণ্ডার নিশ্চিত করাও প্রয়োজন। বর্তমানে রাজশাহী নগরীর অটোরিকশা চালকদের দৌরাত্ম্য কেবল একটি সাধারণ পরিবহন সমস্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি এখন নাগরিক অধিকার লঙ্ঘনের পর্যায়ে পৌঁছেছে। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন যাত্রী কিংবা বয়স্কদের প্রতিও চালকদের অসহিষ্ণু আচরণ অহরহ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। অটোরিকশা চালক সমিতির নেতাদের সাথে স্থানীয় অসাধু সিন্ডিকেটের যোগসাজশ রয়েছে বলেও জনশ্রুতি রয়েছে। ফলে প্রশাসনিকভাবে ব্যবস্থা নিতে গেলেই নানা জটিলতার অজুহাত দেখানো হয়। কিন্তু নগরবাসীর প্রশ্ন—এই পরিস্থিতি আর কতদিন চলবে? একটি আধুনিক ও পরিকল্পিত নগরী হিসেবে রাজশাহীর ভাবমূর্তি রক্ষায় এই অরাজকতা থামানো অত্যন্ত জরুরি। রাজশাহী সিটি করপোরেশন যদি এখনই এই অরাজকতা রুখতে কঠোর অবস্থান গ্রহণ না করে, তবে সাধারণ যাত্রীদের ভোগান্তি আরও বাড়বে। চালকদের এই বেপরোয়া আচরণের লাগাম টেনে না ধরলে নগরীর সড়কে শৃঙ্খলা ফিরবে না। সাধারণ যাত্রীদের জিম্মি করে অর্থ উপার্জনের এই সংস্কৃতি বন্ধ করতে সিটি কর্তৃপক্ষকে অবিলম্বে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। নগরবাসী আশা করছেন, সিটি করপোরেশন কেবল সভা-সেমিনারেই সীমাবদ্ধ না থেকে মাঠ পর্যায়ে কঠোর তদারকি ও ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে অটোরিকশা সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য বন্ধ করবে এবং জননিরাপত্তা ও যাতায়াতের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনবে। রাজশাহীর সড়কগুলো কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে চলতে পারে না। এখানে সাধারণ মানুষের নির্বিঘ্নে চলাচলের অধিকার নিশ্চিত করা সিটি করপোরেশনের দায়িত্ব ও কর্তব্য। আশা করা যাচ্ছে, কর্তৃপক্ষ বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করবে এবং অচিরেই জনস্বার্থে কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।

সম্পর্কিত নিউজ

অ্যাপ ইনস্টল করুন

এই নিউজ পোর্টালটি মোবাইল অ্যাপের মতো ব্যবহার করুন।