রামেকের ওয়াশরুম: চিকিৎসার নামে 'নরক দর্শন'!

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশ : ২১ জুন ২০২৬, ০৮:৫১ পিএম আপডেট : ২২ জুন ২০২৬, ০৫:২৭ এএম ২৬ বার পঠিত
রামেকের ওয়াশরুম: চিকিৎসার নামে 'নরক দর্শন'!

রামেকের ওয়াশরুম: চিকিৎসার নামে 'নরক দর্শন'!

সংবাদ ২৪ ঘন্টা
২১ জুন ২০২৬
যেখানে মানুষ আসে রোগ থেকে মুক্তি পেয়ে নতুন জীবন পেতে, উত্তরবঙ্গের সেই প্রধান চিকিৎসাকেন্দ্র রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের (রামেক) সাধারণ ওয়ার্ডগুলোতে এখন ওত পেতে আছে হাজারো প্রাণঘাতী জীবাণু। চিকিৎসাসেবা তো দূরের কথা, হাসপাতালের সাধারণ ওয়ার্ডের ওয়াশরুমগুলোর বর্তমান চিত্র দেখলে চেনার উপায় নেই এটি কোনো হাসপাতাল নাকি কোনো পরিত্যক্ত ময়লার ভাগাড়। তীব্র ও দমবন্ধ করা দুর্গন্ধ, নোংরা পরিবেশ আর উপচে পড়া আবর্জনার কারণে হাসপাতালের ভেতরেই তৈরি হয়েছে চরম স্বাস্থ্যঝুঁকি। সেবা নিতে এসে উল্টো মারাত্মক সব রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কায় দিন কাটছে রোগী ও স্বজনদের। গতকাল ২২ জুন (রবিবার) হাসপাতালের কয়েকটি সাধারণ ওয়ার্ডে সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে এক চূড়ান্ত ও গা শিউরে ওঠার মতো অব্যবস্থাপনার চিত্র। ওয়াশরুমগুলোর দরজা ভাঙা, যার কারণে রোগী—বিশেষ করে নারী রোগীদের গোপনীয়তা ও নিরাপত্তা চরমভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে। মেঝেতে সার্বক্ষণিক জমে আছে নোংরা, পিচ্ছিল ও কালচে পানি। কমোড ও প্যানগুলো দীর্ঘদিন পরিষ্কার না করায় সেখানে স্থায়ীভাবে শ্যাওলা ও বর্জ্যের পুরু স্তর পড়ে গেছে, যা থেকে অনবরত ছড়াচ্ছে তীব্র বিষাক্ত দুর্গন্ধ। শুদ্ধি অভিযানের অভাবে বেসিনগুলোর মুখ ময়লা জমে পুরোপুরি বন্ধ হয়ে থাকায় নোংরা পানি উপচে পড়ছে মূল মেঝেতে। ফলে ওয়াশরুমে পা ফেলার মতো কোনো পরিস্থিতি নেই। দূর-দূরান্ত থেকে আসা অসহায় ও নিরুপায় রোগী এবং তাদের স্বজনদের বাধ্য হয়েই এই চরম অস্বাস্থ্যকর ও নরকতুল্য পরিবেশ ব্যবহার করতে হচ্ছে, যা তাদের শারীরিক ও মানসিক দুর্ভোগকে কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। হাসপাতালের বারান্দা দিয়ে হাঁটার সময়ও সাধারণ মানুষের দম আটকে আসার উপক্রম হয়। চিকিৎসাধীন এক রোগীর স্বজন তীব্র ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করে বলেন, "এখানে সুস্থ মানুষ আসলে নিশ্চিত নতুন রোগ নিয়ে বাড়ি ফিরবে। ওয়াশরুমের ভেতরে ঢোকা তো দূরের কথা, বারান্দা দিয়ে হাঁটার সময়ও ওড়না বা কাপড়ে নাক চেপে ধরে রাখতে হয়। আমরা দূর থেকে রোগী নিয়ে এসে চরম বিপদে পড়েছি। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কি চোখ নেই? এগুলো তাদের নজরে পড়ে না? এত বড় একটা সরকারি হাসপাতাল এভাবে চলতে পারে না।" আরেক ভুক্তভোগী নারী রোগী জানান, ওয়াশরুমের এই অবর্ণনীয় ও নোংরা পরিবেশের কারণে অনেকেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা প্রস্রাব-পায়খানা চেপে রাখছেন। চিকিৎসাধীন অবস্থায় দীর্ঘক্ষণ টয়লেট চেপে রাখা বিশেষ করে কিডনি বা ইউরিন ইনফেকশনের (মূত্রনালীর সংক্রমণ) রোগীদের জন্য আরও মারাত্মক ও স্থায়ী বিপদ ডেকে আনছে। হাসপাতালের ভেতরে এমন অমানবিক ও পৈশাচিক পরিস্থিতি কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না বলে মন্তব্য করেন তারা। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, হাসপাতালের এই নোংরা পরিবেশ ও ওয়াশরুম থেকে খুব সহজেই ছড়াতে পারে টাইফয়েড, ডায়রিয়া, জন্ডিস (হেপাটাইটিস) এবং বিভিন্ন ধরনের জটিল ব্যাকটেরিয়াজনিত মারাত্মক ও প্রাণঘাতী রোগ। রামেক হাসপাতালের মতো একটি বৃহৎ চিকিৎসাকেন্দ্রে প্রতিদিন শত শত দুর্বল রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাসম্পন্ন মানুষ একসঙ্গে অবস্থান করছেন। এমন সংবেদনশীল জায়গায় এই ধরনের নোংরা পরিবেশ পুরো হাসপাতালের সামগ্রিক চিকিৎসাসেবা কার্যক্রম এবং সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থার মানকেই বড় ধরনের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে। এই ভয়াবহ অব্যবস্থাপনার বিষয়ে হাসপাতাল প্রশাসনের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা করা হলে তারা কোনো সুনির্দিষ্ট জবাব দেয়নি বা যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। তবে হাসপাতালের অভ্যন্তরে অনুসন্ধানে জানা গেছে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। হাসপাতালে পর্যাপ্ত পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও আয়া-সুইপার থাকা সত্ত্বেও লোকবল সংকটের ঠুনকো অজুহাত দেখিয়ে কাজ ফাঁকি দেওয়া হচ্ছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দায়িত্বশীলদের সূত্রে জানা গেছে, পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা নিয়মিত মাঠে নামেন না এবং তাদের তদারকি করার কেউ নেই। এই বিষয়ে মাঠ পর্যায়ের পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের সাথে কথা বললে তারা নিজেদের দোষ আড়াল করে জানান, তাদেরকে ওপর মহল থেকে নির্দিষ্ট বা বিশেষ কোনো নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে না। ফলে প্রশাসনিক তদারকি ও জবাবদিহিতার চরম অভাবই এই দূরবস্থার মূল কারণ। বছরের পর বছর ধরে কেবল লোকদেখানো আশ্বাস আর দায়সারা পরিষ্কারের নামে সরকারি অর্থের অপচয় হলেও সাধারণ মানুষের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হয়নি। হাসপাতালের মতো অতি জরুরি ও সংবেদনশীল সেবা কেন্দ্রে নিয়মিত কঠোর তদারকি, পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এবং অকেজো ওয়াশরুমগুলো দ্রুত সংস্কার করা এখন সময়ের দাবি। অবিলম্বে এই নরকতুল্য পরিবেশ থেকে সাধারণ মানুষকে মুক্ত করতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও উচ্চপদস্থ কর্তৃপক্ষের কঠোর হস্তক্ষেপ জরুরি।

সম্পর্কিত নিউজ

অ্যাপ ইনস্টল করুন

এই নিউজ পোর্টালটি মোবাইল অ্যাপের মতো ব্যবহার করুন।