মধ্যবিত্তের ঈদ: আনন্দের আলোয় লুকানো এক দীর্ঘশ্বাসের গল্প

সংবাদ ২৪ ঘন্টা প্রকাশ : ২৪ মে ২০২৬, ০২:৫৯ পিএম আপডেট : ২৪ মে ২০২৬, ০৭:১২ পিএম ১৭ বার পঠিত
মধ্যবিত্তের ঈদ: আনন্দের আলোয় লুকানো এক দীর্ঘশ্বাসের গল্প

মধ্যবিত্তের ঈদ: আনন্দের আলোয় লুকানো এক দীর্ঘশ্বাসের গল্প

সংবাদ ২৪ ঘন্টা
২৪ মে ২০২৬
বছর ঘুরে আবার এসেছে পবিত্র ঈদুল ফিতর। এক মাস সিয়াম সাধনার পর আনন্দের বার্তা নিয়ে হাজির হওয়া এই ঈদ মুসলিম উম্মাহর সবচেয়ে বড় উৎসব। চারদিকে আলোর রোশনাই, বিপণিবিতানগুলোতে উপচে পড়া ভিড় আর নতুন পোশাকের সুবাস। কিন্তু এই ঝলমলে উৎসবের আলোর নিচেই জমাট বেঁধে আছে এক নীরব অন্ধকার। যে অন্ধকারের গল্পটি কেবলই এ দেশের চিরবঞ্চিত মধ্যবিত্ত শ্রেণির। যেখানে ঈদের আনন্দ আর জীবনের রূঢ় বাস্তবতা একাকার হয়ে জন্ম দেয় এক নীরব দীর্ঘশ্বাসের। উচ্চবিত্তের কাছে ঈদ মানে যখন আভিজাত্যের প্রদর্শনী আর নিম্নবিত্তের কাছে যখন সরকারি-বেসরকারি যাকাত কিংবা সাহায্যের হাত, ঠিক তখনই মধ্যবিত্ত দাঁড়িয়ে থাকে এক অদ্ভুত দোলাচলে। তারা না পারে লাইনে দাঁড়িয়ে সাহায্য নিতে, না পারে পকেটের শূন্যতা ভুলে উৎসবের জোয়ারে গা ভাসাতে। বাজারের দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি আর সীমিত আয়ের টানাপোড়েনে মধ্যবিত্তের ঈদের বাজেট এখন কাটছাঁটের চরম বেড়াজালে বন্দি। চাল, ডাল, তেল থেকে শুরু করে ঈদের সেমাই-চিনির চড়া দাম মেটাতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে। ফলে উৎসবের আনন্দ যেন এক কঠিন গাণিতিক সমীকরণে রূপ নিয়েছে। ঈদের ফ্যাশন হাউজগুলো যখন নতুন নতুন ডিজাইনের পোশাকে সেজে ওঠে, মধ্যবিত্তের চোখ তখন খোঁজে বাজেটের ভেতরের সাশ্রয়ী দোকানটি। ফুটপাতে দাঁড়াতে আত্মসম্মানে বাধে, আবার বড় শপিং মলে যাওয়ার সাধ্য নেই। সন্তান বা পরিবারের সদস্যদের মুখে হাসি ফোটাতে নিজের শখ-আহ্লাদ বিসর্জন দেওয়াটাই মধ্যবিত্তের চিরন্তন নিয়ম। "ঈদে নিজের জন্য গত তিন বছর কিছু কিনিনি। এবারও বাচ্চার একটা জামা আর স্ত্রীর জন্য একটা সাধারণ শাড়ি কিনতেই পকেট শূন্য। বোনাস আর বেতনের টাকা দিয়ে বাড়িভাড়া আর ঈদের খরচ সামলাতে গিয়ে মনে হচ্ছে নিজেই এক অদৃশ্য ঋণের জালে জড়িয়ে যাচ্ছি।" — নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বেসরকারি ব্যাংক কর্মকর্তা। ঈদে নাড়ির টানে বাড়ি ফেরার আনন্দ মধ্যবিত্তের জন্য অপরিসীম। কিন্তু এই যাত্রার পেছনেও লুকিয়ে থাকে এক নীরব যুদ্ধ। ট্রেনের টিকিটের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা কিংবা বাসের অতিরিক্ত ভাড়া গোনার পর যখন গ্রামে পৌঁছানো হয়, তখন স্বস্তি মিললেও পকেটের অবস্থা থাকে করুণ। গ্রামে গিয়ে আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশীর প্রত্যাশা পূরণ করতে গিয়ে অনেকেই ভেতরে ভেতরে নিঃস্ব হয়ে পড়েন। কিন্তু মুখে ধরে রাখতে হয় এক কৃত্রিম হাসির মুখোশ। মধ্যবিত্তের ঈদ মানেই ত্যাগের এক নীরব মহাকাব্য। সব কষ্ট আড়াল করে ঈদের দিন সকালে সুগন্ধি আতর মেখে, নতুন কিংবা ইস্ত্রি করা পুরনো পাঞ্জাবিটা পরে যখন তারা ঈদগাহে যায়, তখন বাহ্যিকভাবে তাদের সুখীই মনে হয়। কোলাকুলির মাঝে ভুলে থাকার চেষ্টা চলে বুকের ভেতরের জমানো কষ্টগুলো। তবুও দিনশেষে মধ্যবিত্তের ঘরে সেমাই রান্না হয়, টেবিলে সাজানো হয় সাধ্যের ভেতরের সামান্য আয়োজন। কারণ তারা জানে, উৎসবের রঙ যতই ফিকে হোক, পরিবারের মুখের হাসিটুকুই তাদের আসল ঈদ। আনন্দের এই ঝলমলে আলোয় মধ্যবিত্তের বুক চিরে বেরিয়ে আসা দীর্ঘশ্বাসটি হয়তো সমাজের নীতিনির্ধারকদের চোখে পড়ে না, কিন্তু তা প্রতিটা মধ্যবিত্তের ড্রয়িংরুমের চার দেয়ালে ঠিকই প্রতিধ্বনিত হয়। এই দীর্ঘশ্বাস কবে কাটবে, সেই উত্তর হয়তো কারো জানা নেই।

সম্পর্কিত নিউজ

অ্যাপ ইনস্টল করুন

এই নিউজ পোর্টালটি মোবাইল অ্যাপের মতো ব্যবহার করুন।