অনলাইন জুয়ার ঝুঁকিতে কোটি মানুষ

অনলাইন জুয়ার ফাঁদে পড়ার ঝুঁকিতে ২ কোটি মানুষ

সংবাদ ২৪ ঘন্টা প্রকাশ : ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬:১৪ এএম আপডেট : ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬:১৪ এএম ২ বার পঠিত
অনলাইন জুয়ার ফাঁদে পড়ার ঝুঁকিতে ২ কোটি মানুষ

অনলাইন জুয়ার ফাঁদে পড়ার ঝুঁকিতে ২ কোটি মানুষ

সংবাদ ২৪ ঘন্টা
১৪ সেপ্টে ২০২৬
বাংলাদেশে অনলাইন জুয়ার বিস্তার এখন আর তরুণদের বিনোদন বা বিচ্ছিন্ন কিছু অবৈধ কর্মকাণ্ডের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এতে জড়িয়ে পড়ছে। ব্যাংক ও মোবাইল আর্থিক সেবা (এমএফএস) ব্যবস্থার মাধ্যমে এ জুয়ায় বছরে হাজার কোটি টাকা লেনদেন হচ্ছে বলে ধারণা পাওয়া গেছে। এ বিষয়ে পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ (জিইডি) চলতি বছরের জানুয়ারিতে প্রকাশ করা এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছিল, দেশে প্রায় ১ কোটি মানুষ অনলাইন জুয়ার প্রভাবে আক্রান্ত। কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে ২০২৭ সালের মধ্যে এ সংখ্যা ২ কোটি ছাড়িয়ে যেতে পারে। প্রতিবেদনে মাত্র এক থেকে দেড় বছরের মধ্যে অনলাইন জুয়ার ঝুঁকি বেড়ে দ্বিগুণ হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়। জিইডির হিসাবে, বাংলাদেশে অনলাইন জুয়ার বাজারের আকার আনুমানিক ৬ কোটি ২০ লাখ থেকে ৬ কোটি ৮০ লাখ মার্কিন ডলার। বাজারটি প্রতি বছর ৪ দশমিক ৭ থেকে ৬ দশমিক ১ শতাংশ হারে বাড়ছে। অবৈধ হলেও মোবাইল আর্থিক সেবাসহ বিভিন্ন ডিজিটাল মাধ্যমে এসব লেনদেন পরিচালিত হচ্ছে। জুয়ার অর্থ স্থানান্তরে সহায়তা করছে-এমন ১ হাজারের বেশি এজেন্টের সন্ধান পাওয়ার কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। এই ঝুঁকির আর্থিক দিকটি আরও স্পষ্ট হয়েছে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে। এতে উল্লেখ করা হয়, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে অনলাইন বেটিং, জুয়া ও সংশ্লিষ্ট অবৈধ কর্মকাণ্ডে যুক্ত ব্যাংক হিসাবগুলোতে ১ হাজার ৭১৫ কোটি টাকা ডেবিট এবং ১ হাজার ৬৭৩ কোটি টাকা ক্রেডিট লেনদেন হয়েছে। সবচেয়ে বেশি লেনদেন করেছেন বেতনভোগী পেশাজীবীরা। তাদের হিসাবে ৬৪১ কোটি টাকা ডেবিট ও ৬৪২ কোটি টাকা ক্রেডিট হয়েছে। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা গৃহিণীদের হিসাবে লেনদেন হয়েছে ৩৭১ কোটি টাকা ডেবিট ও ৩৪৭ কোটি টাকা ক্রেডিট। কৃষি ও মৎস্য খাতের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের হিসাবে ২৩১ কোটি টাকা ডেবিট ও ২৩২ কোটি টাকা ক্রেডিট হয়েছে। শিক্ষার্থীদের হিসাবেও ১৯৪ কোটি টাকা ডেবিট এবং ১৭৫ কোটি টাকা ক্রেডিট লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে। বিএফআইইউর পর্যবেক্ষণ বলছে, অনলাইন জুয়ার বিস্তার কোনো একটি শ্রেণি বা অঞ্চলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। চাকরিজীবী থেকে গৃহিণী, কৃষক থেকে শিক্ষার্থী-বিভিন্ন শ্রেণির মানুষ এতে যুক্ত হচ্ছেন। বিশেষ করে শিক্ষার্থী ও তরুণদের একটি অংশ নিজেদের সঞ্চয়ের অর্থ এসব কর্মকাণ্ডে ব্যয় করছেন। নিম্ন আয়ের মানুষও এতে যুক্ত হওয়ায় তাদের বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। তবে অনলাইন জুয়ার সবচেয়ে বড় উদ্বেগ শুধু ব্যক্তিগত আর্থিক ক্ষতি নয়; এর সঙ্গে গড়ে উঠছে একটি বিস্তৃত সাইবার অপরাধ অবকাঠামো। এ বিষয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ স্টাডিজ বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান, সহকারী অধ্যাপক মো. শাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘বাংলাদেশে ক্রিপ্টোকারেন্সি ট্রেডিংয়ের বিশাল আন্ডারগ্রাউন্ড মার্কেট সক্রিয়। প্রতারণার মাধ্যমে এমএফএসে আসা অর্থ তারা খুব দ্রুত স্থানীয় এজেন্টদের সাহায্যে ক্রিপ্টোকারেন্সিতে রূপান্তর করে। দেশে আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং চ্যানেলে সরকারের নজরদারি থাকলেও এই ‘শ্যাডো ইকোনমি’ বিদেশিদের অর্থ পাচারের আদর্শ ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে।’ এদিকে পুলিশের তথ্যানুযায়ী, সম্প্রতি ঢাকা, কক্সবাজার ও চট্টগ্রামে পুলিশের একাধিক অভিযানের মধ্য দিয়ে এ-সংক্রান্ত বিষয়ে নানা তথ্য ও নমুনা পাওয়া গেছে। যেমন গত ১০ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রামের খুলশীতে একটি বহুতল ভবন থেকে চীন, পাকিস্তান, লাওস ও ভিয়েতনামের ৬২ নাগরিককে আটক করা হয়। তাদের কাছ থেকে ৭০টির বেশি ল্যাপটপ ও মোবাইলসহ ইলেকট্রনিক ডিভাইস জব্দ করা হয়। এসব ডিভাইসের ফরেনসিক পরীক্ষার পর এদের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যাবে। পুলিশ জানায়, কক্সবাজারে চীনা নাগরিকদের একটি সন্দেহজনক নেটওয়ার্কের সন্ধান পায় পুলিশ। সেখানে প্রায় ২৫০ থেকে ৩০০ চীনা নাগরিক কয়েকটি হোটেল ও রিসোর্ট ভাড়া নিয়ে অবস্থান করছিলেন। অভিযানে বিপুলসংখ্যক মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ ও যোগাযোগ সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, এই চক্র অনলাইন প্রতারণা, অর্থ আত্মসাৎ, অনলাইন জুয়া, ডিজিটাল ক্যাসিনো, ভুয়া ট্রেডিং ওয়েবসাইট ও হ্যাকিংয়ের মতো কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত। এ ছাড়া ঢাকার উত্তরা ও তুরাগে মে মাসের অভিযানে নয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়, যাদের মধ্যে ছয়জন ছিলেন চীনা নাগরিক। তাদের কাছ থেকে তিনটি ৬৪-পোর্টের জিএসএম/জিপিআরএস সিম-মডিউল মেশিন, একটি আট-পোর্ট ও একটি ২৫৬-পোর্টের মেশিন, ২৮০টি সিম কার্ড এবং ২০টি স্মার্টফোন উদ্ধার করা হয়। পুলিশের ধারণা, এসব প্রযুক্তির মাধ্যমে একসঙ্গে শত শত সিম সক্রিয় রেখে জুয়ার লেনদেন, প্রতারণা ও অন্যান্য অবৈধ আর্থিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা হচ্ছিল। পুলিশ আরও জানায়, গত আগস্টে ভাটারা এলাকার এক অভিযানে ৬ হাজারের বেশি সক্রিয় সিমকার্ড ও ২০টি গেটওয়ে ডিভাইস উদ্ধার করা হয়। গ্রেপ্তার চারজনের মধ্যে তিনজন ছিলেন চীনা নাগরিক। ভুয়া চাকরি ও অতিরিক্ত আয়ের প্রলোভন দেখিয়ে পরিচালিত একটি অনলাইন জুয়া নেটওয়ার্কের সঙ্গে এ কার্যক্রমের যোগসূত্র ছিল। প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, সবকিছু মিলিয়ে অনলাইন জুয়ার বাজার এখন শুধু ওয়েবসাইট বা অ্যাপের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এর পেছনে তৈরি হচ্ছে সিমভিত্তিক প্রযুক্তি অবকাঠামো, ভুয়া পরিচয়, ডিজিটাল পেমেন্ট চ্যানেল এবং আন্তদেশীয় অর্থ স্থানান্তরের ব্যবস্থা। ফলে এটি একই সঙ্গে জুয়া, প্রতারণা, সাইবার অপরাধ ও অর্থ পাচারের ঝুঁকি তৈরি করছে। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধবিষয়ক দপ্তরও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে অনলাইন ক্যাসিনো ও জুয়া প্ল্যাটফর্মের বিস্তার নথিভুক্ত করেছে। সংস্থাটির মতে, প্রযুক্তির সহজলভ্যতার কারণে কম মূলধন ও সীমিত প্রযুক্তিগত দক্ষতা দিয়েও অনলাইন ক্যাসিনো পরিচালনা সম্ভব হচ্ছে। এ বিষয়ে মওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক, অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. মুহাম্মদ ওমর ফারুক বলেন, বিদেশিদের এ তৎপরতা প্রতিহত করতে প্রযুক্তিগত উন্নতিসাধন এবং বাংলাদেশে অবস্থানকারী অবৈধ বিদেশিদের আইনের আওতায় আনার বিকল্প নেই। সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন

সম্পর্কিত নিউজ

অ্যাপ ইনস্টল করুন

এই নিউজ পোর্টালটি মোবাইল অ্যাপের মতো ব্যবহার করুন।