৮০ বছরেও থামেনি জীবনসংগ্রাম: মুরগির নেহারি বিক্রি করেই বেঁচে আছেন করিমন বিবি

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশ : ১১ জুলাই ২০২৬, ০৪:১২ পিএম আপডেট : ১১ জুলাই ২০২৬, ০৪:১৮ পিএম ২১ বার পঠিত
৮০ বছরেও থামেনি জীবনসংগ্রাম: মুরগির নেহারি বিক্রি করেই বেঁচে আছেন করিমন বিবি

৮০ বছরেও থামেনি জীবনসংগ্রাম: মুরগির নেহারি বিক্রি করেই বেঁচে আছেন করিমন বিবি

সংবাদ ২৪ ঘন্টা
১১ জুল ২০২৬
জীবনের শেষ প্রান্তে এসে মানুষ সাধারণত একটু নিশ্চিন্ত আশ্রয়, দুই মুঠো স্বস্তির ভাত আর নিরাপদ বার্ধক্যের স্বপ্ন দেখেন। কিন্তু রাজশাহী মহানগরের বহরমপুর এলাকার প্রায় ৮০ বছর বয়সী করিমন বিবির জীবনে সেই স্বস্তির কোনো ছোঁয়া নেই। স্বামী নেই, সন্তান নেই, পাশে দাঁড়ানোর মতো নিকটজনও নেই। বার্ধক্যের ভারে নুয়ে পড়া শরীর, নানা রোগব্যাধি আর চরম আর্থিক সংকট নিয়েই প্রতিদিন জীবিকার সন্ধানে বের হতে হয় তাকে। রাজশাহী নগরের বহরমপুর মোড়ে প্রতিদিন বিকেল হলেই দেখা মেলে করিমন বিবির। ছোট্ট একটি পাত্রে সাজিয়ে বসেন মুরগির চামড়া, কলিজা, গিলা, পাখার হাড় ও নেহারির উপকরণ। নিম্ন আয়ের ও মধ্যবিত্ত অনেক মানুষ তুলনামূলক কম দামে এসব কিনে নিয়ে যান। দিনের শেষে এই সামান্য বিক্রির টাকাই করিমনের বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন। স্থানীয়দের ভাষ্য, বহু বছর ধরেই একই জায়গায় একইভাবে ব্যবসা করে আসছেন করিমন। সময় বদলেছে, চারপাশের মানুষ বদলেছে, কিন্তু বদলায়নি তার সংগ্রামের গল্প। বয়স বেড়েছে, শরীর দুর্বল হয়েছে, তবুও জীবনের সঙ্গে লড়াই থামেনি। করিমনের বসবাস বহরমপুর বস্তিতে, রেললাইনের পাশের একটি ছোট্ট কক্ষে। সেখানেই একা থাকেন তিনি। সংসার বলতে আর কেউ নেই। প্রতিদিন বিকেলে প্রায় ৪ থেকে ৫ কেজি মুরগির নেহারির উপকরণ নিয়ে বহরমপুর মোড়ে আসেন। এরপর রাত সাড়ে ১০টা থেকে ১১টা পর্যন্ত বসে থাকেন ক্রেতার আশায়। কিন্তু প্রতিদিন সমান বিক্রি হয় না। কোনো দিন কিছুটা বিক্রি হলেও, আবার কোনো দিন দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও আশানুরূপ ক্রেতা পান না। রাত গভীর হলে অবিক্রীত পণ্য খুব কম দামে বিক্রি করে বাড়ি ফিরতে হয়। অনেক দিন সামান্য পুঁজির টাকাও উঠে আসে না। ফলে লোকসান গুনেই দিন শেষ করতে হয় তাকে। করিমন বিবি জানান, প্রতিদিন এই ব্যবসা থেকে তার আয় হয় মাত্র ১৫০ থেকে সর্বোচ্চ ২০০ টাকা। এই অল্প আয় দিয়েই কোনো রকমে চালাতে হয় খাবারের খরচ, ওষুধ কেনা এবং অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয়। অভাব-অনটন নিত্যসঙ্গী হলেও তিনি কারও কাছে হাত পাততে চান না। নিজের পরিশ্রমের আয়েই জীবন কাটানোর চেষ্টা করেন। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, করিমনের জীবন সংগ্রাম তাদের দীর্ঘদিনের চেনা। বার্ধক্য, অসুস্থতা ও একাকীত্ব—সবকিছুর সঙ্গে লড়াই করেও তিনি এখনো কাজ করে যাচ্ছেন। অনেক সময় এলাকার মানুষ সামর্থ্য অনুযায়ী তাকে আর্থিক সহায়তা করেন বা কিছু পণ্য কিনে উৎসাহ দেন। তবে নিয়মিত কোনো সরকারি সহায়তা বা সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সুবিধা তিনি পান না বলেই দাবি করেন স্থানীয়রা। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, করিমন বিবি একসময় মানসিক সমস্যায় ভুগতেন। পরবর্তীতে তিনি সুস্থ হয়ে উঠলেও ততদিনে বিয়ের বয়স পেরিয়ে যায়। ফলে তার আর সংসার গড়া হয়নি। বর্তমানে বাবা-মা, স্বামী কিংবা সন্তান—কেউই তার পাশে নেই। একাকী জীবন আর কঠিন বাস্তবতার সঙ্গে প্রতিনিয়ত লড়াই করেই কাটছে তার প্রতিটি দিন। স্থানীয়দের মতে, সমাজের প্রবীণ, অসহায় ও কর্মক্ষমতা হারাতে বসা মানুষের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি আরও কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা জরুরি। বিশেষ করে যেসব ব্যক্তি সম্পূর্ণ একা এবং উপার্জনের অন্য কোনো পথ নেই, তাদের নিয়মিত সহায়তার আওতায় আনা প্রয়োজন। তারা অভিযোগ করেন, অনেক ক্ষেত্রেই প্রকৃত অসহায়রা সরকারি ভাতা ও সহায়তা থেকে বঞ্চিত হন, অথচ অপেক্ষাকৃত সচ্ছল ব্যক্তিরা বিভিন্ন সুবিধা পেয়ে যান। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আরও দায়িত্বশীল ভূমিকা প্রত্যাশা করেন তারা। করিমন বিবির গল্প শুধু একজন বৃদ্ধ নারীর সংগ্রামের গল্প নয়; এটি সমাজের সেই সব নীরব মানুষের প্রতিচ্ছবি, যারা প্রতিদিন কঠোর পরিশ্রম করে বেঁচে থাকার চেষ্টা করছেন, অথচ সামাজিক নিরাপত্তার জাল তাদের পর্যন্ত পৌঁছায়নি। জীবনের শেষ বেলায়ও করিমনের হাতে ভিক্ষার থালা নয়, রয়েছে পরিশ্রমের ঝুড়ি। বয়স, অসুস্থতা আর একাকীত্ব তাকে থামাতে পারেনি। স্থানীয়দের আশা, করিমন বিবির মতো অসহায় প্রবীণদের প্রতি সরকার, সমাজের বিত্তবান মানুষ এবং বিভিন্ন সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এগিয়ে আসবে। নিয়মিত সহায়তা, চিকিৎসা সুবিধা এবং সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গেলে জীবনের শেষ সময়টুকু অন্তত কিছুটা স্বস্তি ও মর্যাদার সঙ্গে কাটাতে পারবেন করিমনের মতো অসংখ্য মানুষ।

সম্পর্কিত নিউজ

অ্যাপ ইনস্টল করুন

এই নিউজ পোর্টালটি মোবাইল অ্যাপের মতো ব্যবহার করুন।