ঘামের টাকায় শুধুই শূন্যতা; আমানতকারীর এই কান্নার শেষ কোথায়?
ঘামের টাকায় শুধুই শূন্যতা; আমানতকারীর এই কান্নার শেষ কোথায়?
সংবাদ ২৪ ঘন্টা
২৪ মে ২০২৬
গত কয়েক দশক ধরে দেশের সাধারণ মানুষ তাদের হাড়ভাঙা খাটুনির সঞ্চয় নিরাপদ রাখার সবচেয়ে ভরসার জায়গা হিসেবে বেছে নিয়েছিল ব্যাংকগুলোকে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে দেশের ব্যাংকিং খাতের যে কঙ্কালসার রূপটি উন্মোচিত হয়েছে, তা শুধু উদ্বেগজনকই নয়, বরং পুরো অর্থনৈতিক ব্যবস্থার জন্য এক বড় ধরনের বিপর্যয়। সাধারণ মানুষের মুখে মুখে আজ একটিই আতঙ্কিত প্রশ্ন— "ব্যাংকে আমার টাকা আছে তো?" কিংবা আরও নির্মম বাস্তবতায়, "গ্রাহকের টাকা আজ ব্যাংকে নেই।"
কিছু ব্যাংক গ্রাহকদের আমানতের টাকা ফেরত দিতে পারছে না, ব্যাংকগুলোতে ক্যাশ বা তারল্য সংকট চরম আকার ধারণ করেছে— এই খবরগুলো এখন আর গুজব নয়, অনস্বীকার্য বাস্তব। নিজের প্রয়োজনে জমানো টাকা তুলতে গিয়ে যখন একজন গ্রাহককে ব্যাংক থেকে খালি হাতে বা নামমাত্র কিছু টাকা নিয়ে ফিরতে হয়, তখন সেই ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর মানুষের আর কী অবশিষ্ট থাকে?
বছরের পর বছর ধরে চলা অনিয়ম, দুর্নীতি ও সুশাসনের অভাবই আজ আমাদের এই খাদের কিনারায় এনে দাঁড় করিয়েছে। রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে নামে-বেনামে হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়ে তা আর ফেরত দেওয়া হয়নি। প্রভাবশালী গোষ্ঠী সাধারণ মানুষের আমানতের টাকা লোপাট করে বিদেশে পাচার করেছে, আর নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা হিসেবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সময়মতো কঠোর পদক্ষেপ না নিয়ে কেবল নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করেছে।
একটি দেশের অর্থনীতি সচল থাকে মানুষের বিশ্বাসের ওপর। ব্যাংক যদি গ্রাহকের চাহিদামতো তার নিজের টাকা ফেরত দিতে না পারে, তবে সেই বিশ্বাস ধূলিসাৎ হয়ে যায়। বর্তমানের এই তারল্য সংকটের কারণে মানুষ ব্যাংক থেকে টাকা তুলে ঘরে রেখে দেওয়ার প্রবণতা বাড়াচ্ছে। এর ফলে বাজার থেকে টাকা ব্যাংকিং চ্যানেলের বাইরে চলে যাচ্ছে, যা পুরো দেশের মুদ্রাস্ফীতি এবং অর্থনৈতিক গতিশীলতাকে আরও পঙ্গু করে দিচ্ছে।
সাধারণ মানুষ তাদের চিকিৎসার টাকা, সন্তানের পড়াশোনার খরচ কিংবা পেনশনের শেষ সম্বলটুকু ব্যাংকে রেখে আজ অসহায়। ব্যাংকের কাউন্টারে দাঁড়িয়ে গ্রাহকের চোখের জল দেখার চেয়ে বড় প্রশাসনিক ব্যর্থতা আর হতে পারে না।
আমরা মনে করি, ব্যাংকিং খাতকে এই লাইফ সাপোর্ট থেকে টেনে তুলতে হলে শুধু মুখের কথা বা সান্ত্বনা আর যথেষ্ট নয়। অবিলম্বে অপরাধীদের চিহ্নিত করে তাদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা এবং তা দিয়ে গ্রাহকের টাকা ফেরত দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংককে পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়ে ব্যাংকিং খাতে কঠোর সংস্কার ও 'জিরো টলারেন্স' নীতি বাস্তবায়ন করতে হবে।
মনে রাখতে হবে, দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর থেকে যদি সাধারণ মানুষের আস্থা একবার পুরোপুরি উঠে যায়, তবে সেই অর্থনীতিকে টেনে তোলা কোনো সরকারের পক্ষেই সম্ভব হবে না। গ্রাহকের টাকা ব্যাংকে ফিরিয়ে আনা এবং তা সুরক্ষিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্রকেই নিতে হবে— আর তা করতে হবে এখনই।
শেয়ার করুন
বস্তনিষ্ঠ সংবাদের একমাত্র অনলাইন ঠিকানা