গোরস্তানের পবিত্রতা গিলে খাচ্ছে মাদকের অন্ধকার!
রাজশাহীর টিকাপাড়া গোরস্তানে ‘দরগা’র আড়ালে অনৈতিক কর্মকাণ্ড, ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী
রাজশাহীর টিকাপাড়া গোরস্তানে ‘দরগা’র আড়ালে অনৈতিক কর্মকাণ্ড, ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী
সংবাদ ২৪ ঘন্টা
০২ জুন ২০২৬
পবিত্রতা, নীরবতা আর আলোর প্রক্ষেপণে যে স্থানটি সুরক্ষিত থাকার কথা, সেটিই এখন নিমজ্জিত চরম অন্ধকারে। আর এই অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে রাজশাহীর ঐতিহ্যবাহী টিকাপাড়া গোরস্তানের ভেতর গড়ে ওঠা 'হান আলী হক দরগা শরিফ'কে কেন্দ্র করে দিন-রাত চলছে মাদক সেবন ও অনৈতিক নানা আয়োজন।
পবিত্র এই স্থানের এমন অবমাননায় চরম ক্ষোভ ও অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দা এবং গোরস্তানে স্বজনদের জিয়ারত করতে আসা সাধারণ মানুষ।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গোরস্তানের ভেতরে অবস্থিত হান আলী হক দরগা শরিফকে পুঁজি করে একশ্রেণীর মানুষ অপকর্মে লিপ্ত রয়েছে। প্রতি বছর এখানে ‘ওরস’ নামের মেলা বসিয়ে রাতভর চলে মাদক সেবনের মহোৎসব। এলাকার সচেতন মানুষ এ বিষয়ে গোরস্তান পরিচালনা কমিটির কাছে প্রশ্ন তুললে তারা নিজেদের দায় এড়িয়ে দায় চাপান সিটি কর্পোরেশনের ওপর। কমিটির পক্ষ থেকে বলা হয়, "সিটি কর্পোরেশন আমাদের লাইট বা বাতি দেয় না, তাই গোরস্তান সবসময় অন্ধকারাচ্ছন্ন বা আলোহীন থাকে।"
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, লাইট না থাকার এই অজুহাত মূলত মাদকসেবী ও অপরাধীদের জন্য এক পরম সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক স্থানীয় বাসিন্দা আক্ষেপ করে বলেন, "গোরস্তান হলো অত্যন্ত পবিত্র একটি জায়গা, যেখানে মানুষের শেষ ঠিকানা। এই পবিত্র জায়গার ভেতর মাজার বা দরগা কেন থাকবে? পবিত্রতার আড়ালে এখানে যা চলছে, তা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। অবিলম্বে এই মাজার উচ্ছেদ করা উচিত।"
সূত্র আরও জানিয়েছে, দরগা শরিফে বর্তমানে তিন দিনব্যাপী একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন চলছে। শুধু মাদকের আড্ডাই নয়, এই দরগার লোকজন তাদের উদ্বৃত্ত বা বেঁচে যাওয়া খাবার ও ময়লা-আবর্জনা গোরস্তানের ভেতরেই যত্রতত্র ফেলে রাখছে। ফলে পুরো এলাকায় তীব্র দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে, যা জিয়ারত করতে আসা মানুষদের জন্য চরম অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
৫ই আগস্টের পর বিপর্যয় ও গবাদিপশুর উৎপাত
স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা যায়, সাবেক মেয়রের আমলে পুরো টিকাপাড়া গোরস্তানটি আধুনিকায়ন ও সংস্কার করা হয়েছিল।
কিন্তু গত ৫ই আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে সবকিছু স্থবির হয়ে পড়েছে। যথাযথ তদারকি না থাকায় গোরস্তানের ভেতর অনৈতিক কর্মকাণ্ড, মাদকসেবীদের আনাগোনা এবং গরু-ছাগলের অবাধ বিচরণ ও উৎপাত আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে।
এলাকাবাসীর দাবি, গোরস্তানের প্রতিটি প্রবেশদ্বার বা গেট সবসময় বন্ধ রাখা উচিত, যাতে গবাদিপশু ভেতরে ঢুকে কবরগুলোর ক্ষতি করতে না পারে এবং এর পবিত্রতা নষ্ট না হয়।
রাসিক প্রশাসকের জরুরি হস্তক্ষেপ চান এলাকাবাসী
পবিত্র এই স্থানটির মর্যাদা ও আলো ফিরিয়ে আনতে রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের (রাসিক) বর্তমান প্রশাসক মাহফুজুর রহমান রিটোনের প্রতি জোর দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী মহল। তারা মনে করেন, প্রশাসক যদি বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে দেখেন এবং একটি ব্যতিক্রমী ও জোরালো উদ্যোগ নেন, তবেই এই দুরবস্থা থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব।
গোরস্তানের চারপাশ জুড়ে পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা করা এবং বিভিন্ন ধরণের ফুলের চারা রোপণ করা অত্যন্ত জরুরি। সুপরিকল্পিতভাবে ফুল গাছের পরিচর্যা করা হলে সেই ফুলের সুবাসেই গোরস্তানের প্রকৃত পবিত্রতা ও সুশৃঙ্খল পরিবেশ ফিরে আসবে—এমনটাই প্রত্যাশা সবার। রাসিক প্রশাসনের উদ্যোগে গোরস্তানটি নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা, আলোর অভাব দূর করা এবং মাদক ও মাজারের নামে চলা অপসংস্কৃতি উচ্ছেদে অনতিবিলম্বে কঠোর অভিযান চালুর জোর দাবি জানিয়েছেন সচেতন রাজশাহী নগরবাসী।
শেয়ার করুন
বস্তনিষ্ঠ সংবাদের একমাত্র অনলাইন ঠিকানা