আব্বাকে ছাড়া প্রথম ঈদ— শূন্যতার এক বিষাদময় উৎসব
আব্বাকে ছাড়া প্রথম ঈদ— শূন্যতার এক বিষাদময় উৎসব
সংবাদ ২৪ ঘন্টা
২৪ মে ২০২৬
ঈদ মানেই আনন্দ, ঈদ মানেই খুশি— শৈশব থেকে এই চেনা বাক্যটি শুনেই আমরা বড় হয়েছি। কিন্তু জীবনের গতিপথে এমন একটি সময় আসে, যখন ‘ঈদ’ শব্দটির চিরচেনা আনন্দ এক নিমিষেই বিষাদে রূপ নেয়। বিশেষ করে, মাথার ওপর থেকে বাবার ছায়া সরে যাওয়ার পর যে প্রথম ঈদটি আসে, তা কোনো সন্তানের জন্যই আর পাঁচটা সাধারণ ঈদের মতো হয় না। এবারের ঈদ অনেকের জীবনেই এসেছে তেমন এক ভিন্ন বাস্তবতায়, যেখানে আনন্দের চেয়েও বেশি ভারী হয়ে আছে ‘আব্বা’ নামের এক অপূরণীয় শূন্যতা।
বাঙালি পরিবারে বাবা হলেন এক বিশাল বটবৃক্ষ। রোদ-বৃষ্টি-ঝড় থেকে যিনি পরিবারকে আগলে রাখেন নিঃশব্দে। ঈদের আনন্দকে পূর্ণতা দিতে বাবারা নিজেদের কত শত ইচ্ছা যে কোরবানি দেন, তার হিসাব হয়তো কোনো সন্তানই কখনো পুরোপুরি রাখতে পারে না। ঈদের সকালে বাবার হাত ধরে ঈদগাহে যাওয়া, নতুন পাঞ্জাবি পরে কোলাকুলি করা, আর নামাজ শেষে বাড়ি ফিরে মায়ের হাতের সেমাই খাওয়ার আগে বাবার পকেট থেকে ‘ঈদি’ বা সালামি নেওয়ার যে চিরায়ত আনন্দ—তা আজ অনেকের জীবনেই কেবলই ধূসর স্মৃতি।
আব্বাকে ছাড়া প্রথম এই ঈদে চারপাশের উৎসবের আবহ যেন এক অদ্ভুত একাকীত্ব তৈরি করে। ঘরের কোণে পড়ে থাকা তাঁর খালি চেয়ারটি, আলমারিতে ঝুলে থাকা তাঁর ব্যবহৃত শেষ পাঞ্জাবিটি কিংবা ডাইনিং টেবিলে তাঁর চিরচেনা আসনটি নিঃশব্দে মনে করিয়ে দেয়—তিনি নেই। উৎসবের কোলাহলের মাঝেও মন হাতড়ে বেড়ায় সেই গম্ভীর অথচ স্নেহমাখা কণ্ঠস্বর, যা আর কখনো ‘ঈদ মোবারক’ বলে বুকে টেনে নেবে না। এই শূন্যতা কোনো নতুন পোশাক, সুস্বাদু খাবার কিংবা বাহ্যিক আড়ম্বর দিয়ে পূরণ করা সম্ভব নয়।
তবে এই বিষাদের মধ্যেও লুকিয়ে থাকে জীবনের এক অমোঘ শিক্ষা ও দায়িত্ববোধ। বাবা আমাদের ছেড়ে চলে গেলেও তিনি রেখে গেছেন তাঁর আদর্শ, শিক্ষা এবং মূল্যবোধ। যিনি চলে গেছেন, তাঁর প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা জানানোর শ্রেষ্ঠ উপায় হলো তাঁর দেখানো সততা ও ভালোবাসার পথ ধরে হাঁটা। আজ যিনি আব্বাকে ছাড়া প্রথম ঈদ করছেন, তাঁর কাঁধেই এখন পরিবারের বাকি সদস্যদের আগলে রাখার গুরুদায়িত্ব। বিশেষ করে মা, যিনি জীবনসঙ্গীকে হারিয়ে আজ সবচেয়ে বেশি নিঃস্ব, এই ঈদে তাঁর মুখে হাসি ফোটানো এবং ভাইবোনদের পাশে দাঁড়ানোই হোক প্রয়াত বাবার প্রতি একজন সন্তানের সবচেয়ে বড় উপহার।
সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রেক্ষাপটেও এই দিনটি আমাদের এক মানবিক বার্তা দেয়। আমাদের চারপাশে এমন অনেক মানুষ আছেন, যাঁরা এই ঈদে পিতৃহীন বা অভিভাবকহীন। উৎসবের এই দিনে আমরা যেন কেবল নিজেদের পরিবার নিয়েই মগ্ন না থাকি। আমাদের আশেপাশে থাকা এতিম, অসহায় ও সুবিধাবঞ্চিত সন্তানদের দিকেও যেন আমরা সহানুভূতির হাত বাড়িয়ে দিই। কারণ, সামর্থ্যহীন বা অভিভাবকহীন মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর মধ্যেই ঈদের আসল সার্থকতা নিহিত।
পরিশেষে, চোখের জল মুছে আমাদের মেনে নিতে হবে প্রকৃতির এই অলঙ্ঘনীয় নিয়মকে। যাঁরা এবার আব্বাকে ছাড়া প্রথম ঈদ কাটাচ্ছেন, তাঁদের প্রতি রইলো গভীর সমবেদনা। মহান আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা, তিনি যেন সকল প্রয়াত পিতাকে জান্নাতুল ফেরদাউস নসিব করেন। আর পৃথিবীর বুকে বেঁচে থাকা বাবার স্মৃতিগুলো যেন আমাদের ভেঙে পড়তে না দিয়ে, আগামী দিনে শক্ত পায়ে পথ চলার প্রেরণা জোগায়।
শেয়ার করুন
বস্তনিষ্ঠ সংবাদের একমাত্র অনলাইন ঠিকানা