মা, এক অন্তহীন ভরসার মহাকাব্য
মা, এক অন্তহীন ভরসার মহাকাব্য
সংবাদ ২৪ ঘন্টা
২৪ মে ২০২৬
পৃথিবীর সবচেয়ে মধুর এবং সবচেয়ে শক্তিশালী শব্দটি হলো ‘মা’। দুই অক্ষরের এই শব্দের ভেতর লুকিয়ে আছে সৃষ্টির আদি ও অন্ত। মা কেবল একজন ব্যক্তি নন, তিনি একটি প্রতিষ্ঠান, একটি পরম আশ্রয় এবং নিঃস্বার্থ ভালোবাসার জীবন্ত ইশতেহার। প্রতিবছর একটি নির্দিষ্ট দিনে আমরা ‘মা দিবস’ পালন করি ঠিকই, কিন্তু মায়ের প্রতি ভালোবাসা কিংবা তাঁর ঋণ স্বীকারের বিষয়টি কোনো নির্দিষ্ট তারিখের ফ্রেমে বন্দি করা অসম্ভব। প্রতিটি দিনই আসলে মায়ের, প্রতিটি মুহূর্তই মায়ের ত্যাগের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের।
সময়ের চাকা ঘুরছে তীব্র গতিতে। আধুনিকতার ছোঁয়ায় আমাদের সমাজ ও জীবনযাত্রায় এসেছে ব্যাপক পরিবর্তন। এই ব্যস্ত নাগরিক জীবনে আমাদের চারপাশের অনেক সম্পর্কই আজ সমীকরণ আর স্বার্থের বেড়াজালে আবদ্ধ। কিন্তু এর মধ্যেও যে সম্পর্কটি শতভাগ নিঃশর্ত এবং অপরিবর্তনীয়, তা হলো সন্তানের প্রতি মায়ের ভালোবাসা। সন্তান ভালো থাকুক কিংবা মন্দ, মায়ের স্নেহের আঁচল সবসময়ই তার জন্য উন্মুক্ত থাকে। শৈশবের প্রথম কথা বলা শেখা থেকে শুরু করে জীবনের প্রতিটি কঠিন পদক্ষেপে মায়ের ছায়া আমাদের আত্মবিশ্বাস জোগায়। একজন সফল মানুষের পেছনে যেমন মায়ের অবদান থাকে, তেমনি একজন ব্যর্থ বা সমাজ-বিচ্যুত মানুষকেও বুক দিয়ে আগলে রাখেন কেবল মা-ই।
তবে মুদ্রার উল্টো পিঠও আমাদের দেখতে হয়, যা অত্যন্ত বেদনাদায়ক। আজ সম্পাদকীয় কলামে কেবল মায়ের গুণগান গাইলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না, বরং সমাজের কিছু রূঢ় বাস্তবতার দিকেও চোখ ফেরানো প্রয়োজন। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় যে, বর্তমান সময়ে আমাদের চারপাশে এমন অনেক মায়ের খবর মেলে, যাঁদের শেষ বয়সের ঠিকানা হয় কোনো এক বৃদ্ধাশ্রম। যে মা নিজের সুখ-আহ্লাদ বিসর্জন দিয়ে সন্তানকে মানুষ করলেন, জীবনের শেষ প্রান্তে এসে সেই সন্তানের ঘরেই তাঁর জায়গা হয় না। এটি একটি সভ্য সমাজের জন্য চরম অবক্ষয়ের লক্ষণ।
আমাদের মনে রাখা উচিত, মা কোনো আনুষ্ঠানিকতার নাম নয়। বৃদ্ধ বয়সে মায়ের যত্ন নেওয়া, তাঁকে সময় দেওয়া এবং তাঁর মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যের খেয়াল রাখা প্রতিটি সন্তানের আইনি ও নৈতিক দায়িত্ব। রাষ্ট্র ‘পিতামাতার ভরণ-পোষণ আইন’ প্রণয়ন করেছে ঠিকই, কিন্তু আইন দিয়ে কখনো ভালোবাসা বা দায়িত্ববোধ জবরদস্তি করে আদায় করা যায় না; এটি আসতে হয় মনের গভীর থেকে, পারিবারিক মূল্যবোধ থেকে।
জাতীয় জীবনের অগ্রগতি ও একটি মানবিক সমাজ গঠনে মায়ের ভূমিকা অপরিসীম। নেপোলিয়ন বোনাপার্ট বলেছিলেন, “আমাকে একটি শিক্ষিত মা দাও, আমি তোমাকে একটি শিক্ষিত জাতি দেব।” এই উক্তিটি আজও সমভাবে সত্য। মায়েরা হলেন পরিবারের প্রথম শিক্ষক। তাঁরাই সন্তানের মনে সততা, দেশপ্রেম ও নৈতিকতার বীজ বুনে দেন। তাই মায়েদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্র ও সমাজ উভয়েরই প্রধান দায়িত্ব। বিশেষ করে কর্মজীবী মায়েদের জন্য কর্মক্ষেত্রে উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করা এবং গৃহিণী মায়েদের শ্রমের যথাযথ মূল্যায়ন করা জরুরি।
সবশেষে বলা যায়, মা হলেন পৃথিবীর একমাত্র আলোর উৎস, যা কখনো নিভে যায় না। আসুন, আমরা কেবল বিশেষ কোনো দিনে নয়, বছরের ৩৬৫ দিনই মাকে ভালোবাসবো, শ্রদ্ধা জানাবো। কোনো মায়ের চোখ যেন সন্তানের অবহেলায় অশ্রুসিক্ত না হয়, কোনো মা যেন বৃদ্ধাশ্রমের একাকীত্বে দিন না কাটান—আজকের দিনে এটাই হোক আমাদের অঙ্গীকার। পৃথিবীর সকল মায়ের প্রতি রইলো আমাদের বিনম্র শ্রদ্ধা ও স্যালুট।
শেয়ার করুন
বস্তনিষ্ঠ সংবাদের একমাত্র অনলাইন ঠিকানা