রান্নার বিকল্প হিসেবে বাড়ছে বৈদ্যুতিক চুলার ব্যবহার

ইলেকট্রিক চুলার চাহিদা বাড়ছে, কমছে গ্যাস সিলিন্ডারের বিক্রি

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশ : ১০ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:৩২ পিএম আপডেট : ১০ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:২০ পিএম ২০ বার পঠিত
ইলেকট্রিক চুলার চাহিদা বাড়ছে, কমছে গ্যাস সিলিন্ডারের বিক্রি
ছবি: সংবাদ ২৪ ঘন্টা
১০ অক্টো ২০২৬ | sangbad24ghonta.com
ইলেকট্রিক চুলার চাহিদা বাড়ছে, কমছে গ্যাস সিলিন্ডারের বিক্রি
বিস্তারিত কমেন্টে ↘

রাজশাহীতে এলপিজি সিলিন্ডারের দাম বৃদ্ধি ও সরবরাহ সংকটে কমেছে ক্রেতা। পছন্দের কোম্পানির গ্যাস না পেয়ে কেউ বাড়তি টাকা দিয়ে অন্য ব্র্যান্ডের সিলিন্ডার কিনছেন। বাড়তি এই ব্যয় সামলাতে না পেরে অনেকেই এখন ইলেকট্রিক চুলার দিকে ঝুঁকছেন। ফলে রাজশাহীতে সিলিন্ডার গ্যাসের ক্রেতা কমছে এবং বাড়ছে বিকল্প জ্বালানির ওপর নির্ভরতা। এতে রান্নার মাসিক খরচ বেড়ে যাওয়ায় অনেক পরিবারকে নতুন করে হিসাব কষতে হচ্ছে।


এক মাস আগেও ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডার ১৭৫০ টাকায় পাওয়া যেত, এখন এর জন্য গুনতে হচ্ছে ২১০০ থেকে ২৩০০ টাকা। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে ব্র্যান্ড সংকট। সরকার ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ১৮৩৭ টাকা নির্ধারণ করেছে। তবে ভোক্তাদের অভিযোগ, বাজারে এই দামে গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না।  

রাজশাহী নগরীর পদ্মা আবাসিক এলাকায় সকাল ১০ টায় সুমনা চৌধুরীর বাসায় দিনের রান্না শুরু করেন গৃহকর্মী। কিন্তু সিলিন্ডার গ্যাস শেষ হয়ে যাওয়ায় রান্না করা সম্ভব হয়নি। দোকানে কয়েক দফা যোগাযোগ করেও পাওয়া যায়নি ওই কোম্পানির গ্যাস। এছাড়াও নগরীর বিভিন্ন দোকানেও যোগাযোগ করে পাননি গ্যাসের সিলিন্ডার। অন্য কোম্পানির গ্যাসের সিলিন্ডার নিতে খরচ হবে আরও ১৫০০ টাকা। তাই বাধ্য হয়ে পরিবারের রান্না চালিয়ে নিতে বাধ্য হয়ে রান্নার বৈদ্যুতিক সরঞ্জামের দিকে ঝুঁকেছেন সুমনা।


গ্যাস সংকট দীর্ঘায়িত হওয়ায় ৭ হাজার ৫০০ টাকা খরচ করে একটি ইনফ্রারেড কুকার কিনেছেন তিনি। সঙ্গে কিনেছেন রাইস কুকারও। অথচ গ্যাস সংকটের আগে এসব যন্ত্র তার রান্নাঘরে খুব একটা প্রয়োজনই হতো না।


সুমনার মতো রাজশাহী নগরীর অনেক পরিবারকেই এখন একই বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। গ্যাসের দামের বৃদ্ধির কারণে ঝুঁকছেন ইলেকট্রিক চুলার দিকে। গ্যাসে অভ্যস্ত পরিবারগুলোকে রান্নার বিকল্প ব্যবস্থা করতে হচ্ছে। আর তাতে বাড়ছে বাড়তি খরচও।

 

নগরীর মহিষবাথান এলাাকার বাসিন্দা সাগর আহমেদ পড়েন একই সমস্যায়। শুক্রবার (৮ অক্টোবর) তার বাসার গ্যাস শেষ হয়ে যায়। খালি সিলিন্ডারটি ছিল বসুন্ধরা ব্র্যান্ডের। সেটি নিয়ে তিনি গ্যাসের দোকানে যান। কিন্তু সেখানে বসুন্ধরার গ্যাস পাওয়া যায়নি। দোকানি তাকে গ্যাসসহ নতুন একটি সিলিন্ডার কিনতে বলেন। এতে দাম পড়ে প্রায় ৩২০০ টাকা। বাড়তি এই টাকা দিতে রাজি না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত গ্যাস না কিনেই ফিরে যান মিরাজুল। এখন ইলেকট্রিক চুলায় রান্না করছেন তিনি।

শনিবার (১০ অক্টোবর) নগরীর সাহেববাজার এলাকায় সরজমিনে দেখা মেলে, ইলেকট্রিক চুলার চাহিদা বেড়েছে। ওয়ালটন, ভিশন, ভিগো, কিয়াম, গাজী, মিয়াকো ও ফিলিপসের বৈদ্যুতিক কুকার বিক্রি হচ্ছে। নোভা ও প্রেস্টিজও এ বাজারে আছে।

 

আরডিএ মার্কেটের ব্যবসায়ী সাইফুল  ইসলাম সংবাদ ২৪ ঘন্টাকে বলেন, গেল বছরের চেয়ে এ বছরে ইলেকট্রিক চুলার চাহিদা বেড়েছে। প্রতিদিন এখন ৪০ থেকে ৫০টা করে চুলা বিক্রি করা হচ্ছে। যার বেশিই ইনফ্রারেড কুকার। ইনডাকশন কুকার বিক্রি হচ্ছে তবে তার চাহিদা কম। ইনফ্রারেড কুকারে যেকোন পাতিল দেওয়া যায়। কিন্তু ইনডাকশন কুকারে সব ধরনের পাতিল ব্যবহার করা যায় না। তাই চাহিদা কমেছে। 

 

ওয়ালটনের বিক্রয়কর্মী সোহেল সংবাদ ২৪ ঘন্টাকে বলেন, গ্যাস সংকট ও সিলিন্ডার গ্যাসের দাম বাড়ার কারণে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় তাদের বৈদ্যুতিক কুকারের চাহিদা সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। মানুষ গ্যাসের চুলা থেকে বৈদ্যুতিক কুকারের দিকে যেতে শুরু করেছে। চাহিদা স্পষ্টভাবেই বাড়ছে। ভোক্তারা বিকল্প খুঁজছেন। আর বৈদ্যুতিক কুকার সেই বিকল্প হিসেবে নির্ভরযোগ্য সমাধান দিচ্ছে। 

 

তিনি বলেন, ওয়ালটনের ১২ থেকে ১৫ ধরনের ইনডাকশন ও ইনফ্রারেড কুকার রয়েছে। এসব কুকারের দাম ৩ হাজার ৭৯০ থেকে ৫ হাজার ৭৯০ টাকার মধ্যে। ইনফ্রারেড কুকারের জনপ্রিয়তার অন্যতম কারণ হলো এতে বাসায় থাকা সাধারণ হাঁড়ি-পাতিল ব্যবহার করা যায়। অন্যদিকে ইনডাকশন কুকারের জন্য বিশেষ ধরনের হাঁড়ি ও প্যান প্রয়োজন হয়। 

 

রাজশাহীর এলপিজি বাজারে এখন একদিকে ক্রেতা কমছে, অন্যদিকে বদলে যাচ্ছে ভোক্তাদের জ্বালানি ব্যবহারের ধরন। দাম ও সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে বিকল্প জ্বালানির ওপর নির্ভরতা আরও বাড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। দাম বৃদ্ধি ও সরবরাহ সংকটের প্রভাব এখন শুধু গ্যাসের দোকানে সীমাবদ্ধ নেই। রান্নার জ্বালানি হিসেবে বিকল্প ব্যবহারের প্রবণতাও বাড়ছে। বিশেষ করে যেসব পরিবার নিয়মিত এলপিজির ওপর নির্ভরশীল, তাদের অনেকেই খরচ কমাতে ইলেকট্রিক চুলার দিকে যাচ্ছেন।

রাজশাহী রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সাধারণ সম্পাদক জামাত খান বলেন, এক লাফে ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডার গ্যাসের দাম ২৫২ টাকা বাড়ানো হয়েছে। এ সুযোগে অসাধু ডিলার ব্যবসায়ীরা বাজারে সরবরাহ কমিয়ে দিয়ে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে খুচরা বিক্রেতা ও ক্রেতাদের হয়রানি করছেন। পাশাপাশি খুচরা বিক্রেতারাও এর সুযোগ নিয়ে বেশি দামে এলপিজি গ্যাস সিলিন্ডার বিক্রি করছেন।

তিনি আরও সংবাদ ২৪ ঘন্টাকে বলেন, মাঝখান থেকে ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয় পক্ষই আর্থিকভাবে চরম ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। এই অবস্থা চলতে পারে না। সরকারকে অতিসত্ত্বর মনিটরিং করে এলপিজি গ্যাস সিলিন্ডারের ভোগান্তি থেকে গ্রাহকদের রেহাই দেওয়ার জোর দাবি জানাচ্ছি।


এ বিষয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহা. ফরিদ উদ্দীন খান
সংবাদ ২৪ ঘন্টাকে বলেন, এলপিজি গ্যাসের দাম বৃদ্ধি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবারগুলোকে রান্নার জ্বালানির জন্য বাড়তি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। এর সঙ্গে সরবরাহ সংকট যুক্ত হওয়ায় বাজারে সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে গ্যাস বিক্রির সুযোগ তৈরি হচ্ছে। ফলে ভোক্তাদের ওপর বাড়তি আর্থিক চাপ পড়ছে।


তিনি আরও বলেন, গ্যাসের দাম বাড়ায় ভোক্তারা স্বাভাবিকভাবেই বিকল্প জ্বালানির দিকে ঝুঁকবেন। ইলেকট্রিক চুলার ব্যবহার বাড়া তারই একটি উদাহরণ। তবে বিদ্যুতের দাম ও পরিবারের আয় বিবেচনায় এই বিকল্প সবার জন্য সমান সাশ্রয়ী নয়। তাই সরকারকে এলপিজির সরবরাহব্যবস্থা স্বাভাবিক করার পাশাপাশি নির্ধারিত দামে বিক্রি হচ্ছে কি না, তা কঠোরভাবে মনিটরিং করতে হবে।

সম্পর্কিত নিউজ

অ্যাপ ইনস্টল করুন

এই নিউজ পোর্টালটি মোবাইল অ্যাপের মতো ব্যবহার করুন।