লাখ টাকার গরুর চামড়া ৬০০, ছাগলেরটা কেউ নেয়ই না: রাজশাহীতে মাথায় হাত বিক্রেতাদের
লাখ টাকার গরুর চামড়া ৬০০, ছাগলেরটা কেউ নেয়ই না: রাজশাহীতে মাথায় হাত বিক্রেতাদের
সংবাদ ২৪ ঘন্টা
২৮ মে ২০২৬
বিগত কয়েক বছরের ধারাবাহিকতায় এবারও ঈদুল আজহা-পরবর্তী চামড়ার বাজারে চরম বিপর্যয় নেমে এসেছে। সরকারের পক্ষ থেকে চামড়ার মূল্য নির্ধারণ এবং পাচার রোধে নানা পদক্ষেপ নেওয়া হলেও মাঠপর্যায়ে এর কোনো সুফল মেলেনি।
রাজশাহীতে পানির দামে বিক্রি হয়েছে কোরবানির পশুর চামড়া। এমনকি অনেক স্থানে গরুর চামড়া কিনলে ছাগলের চামড়া ‘ফ্রি’ দেওয়ার মতো নজিরবিহীন ঘটনাও ঘটেছে। দাম না পেয়ে ক্ষোভে-হতাশায় অনেকেই ছাগলের চামড়া মাটিতে পুঁতে ফেলেছেন কিংবা রাস্তায় ফেলে গেছেন।
রাজশাহী মহানগরীর সপুরা, নওদাপাড়া, শালবাগান, দড়িখড়বোনা ও তালাইমারীসহ বিভিন্ন চামড়ার আড়ত ঘুরে দেখা গেছে চরম মন্দাভাব। আড়তদাররা ছোট-বড় আকৃতির গরুর কাঁচা চামড়া (লবণ ছাড়া) গড়ে ৬০০ থেকে ৬৫০ টাকায় কিনছেন।
অন্যদিকে, ছাগলের চামড়ার বাজার সম্পূর্ণ ধসে পড়েছে। ঈদের প্রথম দিন ছাগলের চামড়া ৫ থেকে ১০ টাকা পিস বিক্রি হলেও দ্বিতীয় দিনে তা কেউ অবহেলাতেও নিতে চাননি। ফলে যাদের গরু ও ছাগল উভয়ই কোরবানি ছিল, তাদের গরুর চামড়ার সঙ্গে ছাগলের চামড়া বিনামূল্যে দিতে হয়েছে।
মহানগরীর সপুরা এলাকার বুলবুল আহমেদ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন,"১ থেকে ২ লাখ টাকার গরুর চামড়ার দাম বলা হচ্ছে মাত্র ৬০০ টাকা! চামড়া খাতের এই হরিলুটের কোনো সদুত্তর কারও কাছে নেই। প্রতি বছরই সাধারণ মানুষকে এভাবে ঠকানো হচ্ছে।"
পাড়া-মহল্লা ঘুরে বেশি দামে চামড়া কিনে আড়তে এসে ব্যাপক লোকসানের মুখে পড়েছেন সাধারণ ও মৌসুমি ব্যবসায়ীরা। মালদহ কলোনি এলাকার মৌসুমি ব্যবসায়ী মো. আকবর জানান, তিনি ভালো লাভের আশায় ৫০০ থেকে ৮০০ টাকা দরে ৫০ পিস গরুর চামড়া সংগ্রহ করেছিলেন।
কিন্তু সপুরার পাইকারি আড়তে আসার পর আড়তদাররা চামড়ায় নানা খুঁত ও ত্রুটি দেখিয়ে নামমাত্র দাম হাঁকেন। শেষ পর্যন্ত পুঁজি হারিয়ে বিপুল লোকসানে চামড়াগুলো বিক্রি করতে বাধ্য হন তিনি। লাভ তো দূরের কথা, দিনভর হাড়ভাঙা খাটুনির পারিশ্রমিকও জোটেনি তার।
শালবাগান এলাকার অভিজ্ঞ চামড়া ব্যবসায়ী জাবেদ আলী সংবাদ ২৪ ঘন্টাকে জানান, কাঁচা চামড়া ব্যবসার সেই রমরমা দিন এখন অতীত। গত ৯ থেকে ১০ বছর ধরে একই সিন্ডিকেটের কারণে বাজার অবিন্যস্ত। তিনি বলেন, "ছাগলের চামড়া কিনে পরে ফেলে দিতে হয়, আড়তদাররা নিতে চান না। তাই এবার চামড়া পচে দুর্গন্ধ ছড়ানোর ভয়ে কোরবানিদাতারা বিনা পয়সায় আমাদের ছাগলের চামড়া দিয়ে গেছেন। তবে এ বছর লবণের দাম ও প্রক্রিয়াজাতকরণ খরচ বাড়ায় আমরাও খুব বেশি ঝুঁকি নিতে পারছি না।"
কাগজে-কলমে দাম বাড়লেও মাঠপর্যায়ে নেই প্রভাব
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এবার ঢাকার বাইরে গরুর প্রতি বর্গফুট লবণযুক্ত চামড়ার দাম ৫০-৫৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল, যা গত বছরের তুলনায় কিছুটা বেশি। তবে রাজশাহীর মতো বিভাগীয় শহরের বাজারে এর কোনো ইতিবাচক প্রভাব দেখা যায়নি। উল্টো আড়তদাররা চামড়া ত্রুটিপূর্ণ বা কাটা-ছেঁড়া উল্লেখ করে দাম আরও কমিয়ে দিয়েছেন।
সার্বিক পরিস্থিতির বিষয়ে রাজশাহী চামড়া ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি আসাদুজ্জামান মাসুদ সংবাদ ২৪ ঘন্টাকে বলেন,"সরকারিভাবে দাম কিছুটা বাড়ানো হলেও কেনাবেচায় তার বড় কোনো প্রভাব পড়েনি। তবে সব চামড়া যে ৬০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে তা নয়, ভালো মানের কিছু চামড়া এক হাজার টাকায়ও কেনাবেচা হয়েছে।"
ছাগলের চামড়ার বাজারের করুণ অবস্থার বিষয়ে তিনি ব্যাখ্যা দেন,"সাধারণ মানুষ ছাগল জবাই বা চামড়া ছাড়ানোর সময় অসচেতন থাকেন। এতে চামড়া কেটে বা ফুটো হয়ে নষ্ট হয়ে যায়। আড়তদাররা ত্রুটিপূর্ণ চামড়া কিনতে চান না। তবে এবার চামড়ার আমদানি ভালো হয়েছে। সব চামড়া লবণ দিয়ে প্রক্রিয়াজাতকরণের পর প্রকৃত হিসাব জানা যাবে।"
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, নীতিমালার যথাযথ প্রয়োগ এবং স্থানীয় পর্যায়ে আড়তদারদের সিন্ডিকেট ভাঙা না গেলে চামড়া শিল্পের এই বিপর্যয় থেকে উত্তরণ সম্ভব নয়।
শেয়ার করুন
বস্তনিষ্ঠ সংবাদের একমাত্র অনলাইন ঠিকানা