লক্ষ্যমাত্রা ছাড়াল পাটের আবাদ: ভালো ফলন ও দামে নাটোরে কৃষকের মুখে হাসি
লক্ষ্যমাত্রা ছাড়াল পাটের আবাদ: ভালো ফলন ও দামে নাটোরে কৃষকের মুখে হাসি
সংবাদ ২৪ ঘন্টা
০৩ আগ ২০২৬
ভালো বাজারদর, অনুকূল আবহাওয়া আর পরিবেশবান্ধব পাটের চাহিদা বাড়ায় নাটোরে চলতি মৌসুমে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক বেশি জমিতে আবাদ হয়েছে। বর্তমানে জেলাজুড়ে পুরোদমে চলছে পাট কাটা, পচানো ও আঁশ ছাড়ানোর কাজ। খাল-বিল, নদী আর জলাশয়ে কৃষাণ-কৃষাণীদের কর্মব্যস্ততায় গ্রামীণ জনপদে তৈরি হয়েছে এক উৎসবমুখর পরিবেশ।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই) সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে জেলায় ৩০ হাজার ৮৮০ হেক্টর জমিতে পাট চাষের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল। তবে তা ছাড়িয়ে চাষ হয়েছে ৩৫ হাজার ৬৬ হেক্টর জমিতে। বিগত এক দশকের তুলনায় জেলায় পাটের আবাদ প্রায় দ্বিগুণ বেড়েছে। এ পর্যন্ত ১৪ হাজার ৮০০ হেক্টর জমির পাট কাটা শেষ হয়েছে, যা থেকে পাওয়া গেছে প্রায় ৩০ হাজার ৯৯০ টন আঁশ।
জেলাজুড়ে এখন নতুন পাট শুকানোর ধুম পড়েছে। বাঁশের আড়, ব্রিজের রেলিং কিংবা বাড়ির আঙিনায় মেলা রয়েছে নতুন সোনালী আঁশ। আর রাস্তার পাশে সাজিয়ে রাখা হয়েছে পাটখড়ির শক্ত বাঁধা।
সিংড়া উপজেলার সাউল ও লারুয়া গ্রাম এবং হাতানিয়ানাদাহ এলাকার গোদাই নদীতে সরেজমিনে দেখা যায়, নারী-পুরুষ দল বেঁধে পাট পচানো ও আঁশ ছাড়ানোর কাজ করছেন। এবার নারীদের অংশগ্রহণ নজর কাড়ার মতো। সাউল গ্রামের ভানু বেওয়ার মতো অনেকেই কাজের বিনিময়ে কেবল পাটখড়ি সংগ্রহ করছেন। হাতানিয়ানাদাহ এলাকায় শ্রমিকের কাজ করা হারেজ মিয়া জানান, ১০ জনের দল নিয়ে কাজ করে দিনে জনপ্রতি প্রায় ৭০০ টাকা আয় করছেন তারা। আবার কেউ আঁটিপ্রতি সাড়ে চার টাকা মজুরিতেও কাজ করছেন। পড়াশোনার পাশাপাশি পরিবারের কাজে হাত বাড়িয়েছে মাধ্যমিকের শিক্ষার্থী হাফসাও।
লারুয়া গ্রামের কৃষক রমিজুল এ বছর দুই বিঘা জমিতে পাট আবাদ করেছেন। তিনি জানান, আষাঢ় ও শ্রাবণ মাসের পর্যাপ্ত বৃষ্টিতে আশেপাশের জলাশয়গুলো পানিতে ভরে গেছে। এতে পাট পচানো সহজ হয়েছে এবং পরিবহন খরচ অনেক বেঁচে গেছে। তবে ঘন ঘন বৃষ্টির কারণে রোদ না পাওয়ায় আঁশ শুকাতে কিছুটা বেগ পেতে হচ্ছে।
নলডাঙার বাসিলা গ্রামের আরিফুল ইসলাম জানান, গম বা ডাল কাটার পর এবং আমন ধান রোপণের মাঝামাঝি সময়ে পাট চাষ করলে জমি অনাবাদী থাকে না। চৈত্র মাসের শুরুতে বোনা পাট আমন চাষের আগেই কেটে নেওয়া যায়।
গুরুদাসপুরের নজিরপুর, নাটোর সদরের তেবাড়িয়া এবং সিংড়ার হাতানিয়ানাদাহ হাটে ইতোমধ্যেই নতুন পাট কেনাবেচা শুরু হয়ে গেছে। হাতানিয়ানাদাহ বাজারে নতুন পাট বিক্রি করতে আসা কৃষক ফিরোজ আলী জানান, তিনি প্রতি মণ পাট সাড়ে তিন হাজার টাকায় বিক্রি করেছেন। বাজারে বর্তমানে মানভেদে প্রতি মণ পাট ৩ হাজার থেকে ৪ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বাজার আরও জমলে দাম আরও কিছুটা বাড়তে পারে বলে আশা প্রকাশ করেছেন প্রবীণ ব্যবসায়ী আজিজুল ইসলাম মেম্বার।
ফলনের বিষয়ে নাটোর সদর উপজেলার হইবাতপুর ব্লকের উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. মিজানুর রহমান জানান, তাঁর এলাকায় বিঘাপ্রতি গড়ে ৯ মণ পাট পাওয়া যাচ্ছে। অন্যদিকে সিংড়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা খন্দকার ফরিদ হাসান জানান, তাঁদের উপজেলায় বিঘাপ্রতি গড় ফলন পাওয়া যাচ্ছে সাড় আট মণ।
নাটোর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. হাবিবুল ইসলাম খান বলেন, “চলতি মৌসুমে পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত পাট পচানোর উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করে দিয়েছে। দেশে ও বিদেশে পরিবেশবান্ধব পণ্যের চাহিদা বাড়ায় পাটের ব্যবহার আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে। কাঙ্ক্ষিত দাম পাওয়ায় কৃষকরাও আবাদে উদ্বুদ্ধ হচ্ছেন। সরকারের প্রণোদনার পাশাপাশি কৃষি বিভাগ আধুনিক প্রযুক্তি ও প্রশিক্ষণ দিয়ে চাষিদের পাশে রয়েছে।”
সংবাদ সূত্র: বাসস
শেয়ার করুন
বস্তনিষ্ঠ সংবাদের একমাত্র অনলাইন ঠিকানা