নীরব বিপ্লব: দেশের প্রধান মিঠা পানির মাছ উৎপাদনকারী অঞ্চল এখন রাজশাহী
নীরব বিপ্লব: দেশের প্রধান মিঠা পানির মাছ উৎপাদনকারী অঞ্চল এখন রাজশাহী
সংবাদ ২৪ ঘন্টা
০৩ আগ ২০২৬
স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে দেশব্যাপী বাজার সম্প্রসারণের মাধ্যমে বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান মিঠা পানির মাছ উৎপাদন কেন্দ্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে রাজশাহী বিভাগ। এখান থেকে উৎপাদিত রুই, কাতলা, মৃগেল ও পাবদাসহ দেশীয় প্রজাতির মাছ এখন ঢাকাসহ দেশের অন্তত ২৫টি জেলায় নিয়মিত সরবরাহ করা হচ্ছে। কেবল দেশেই নয়, প্রতিবেশী দেশ ভারতেও রপ্তানি হচ্ছে রাজশাহীর মাছ।
বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্টদের মতে, মিঠা পানির কার্পজাতীয় মাছের বাণিজ্যিক চাষ উত্তরবঙ্গের গ্রামীণ অর্থনীতিতে এক অভূতপূর্ব পরিবর্তন এনেছে। শস্য ও অন্যান্য কৃষিপণ্যে কাঙ্ক্ষিত মুনাফা না পেয়ে চাষিরা এখন ব্যাপকভাবে বাণিজ্যিক পুকুর খননের দিকে ঝুঁকছেন।
রাজশাহী বিভাগীয় মৎস্য দপ্তরের পরিচালক সাইফুদ্দিন ইয়াহিয়া জানান, বিভাগের আটটি জেলায় মোট ৪ লাখ ৪৯ হাজার ৬৫৩টি পুকুরে মাছ চাষ হচ্ছে। এই খাতের সাথে প্রায় ১ লাখ ৬৫ হাজার মানুষ সরাসরি সম্পৃক্ত এবং বর্তমানে এখান থেকে বছরে ৫ লাখ মেট্রিক টনেরও বেশি মাছ উৎপাদিত হচ্ছে। স্থানীয় চাহিদা মেটানোর পর প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার মেট্রিক টন মাছ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পাঠানো হয়। সামগ্রিকভাবে এই খাত ঘিরে তৈরি হয়েছে প্রায় ৩ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান।
মাছ উৎপাদনে বিভাগের নাটোর ও নওগাঁ জেলা শীর্ষস্থানে রয়েছে। প্রতিদিন রাজশাহী থেকে পাঁচ শতাধিক ট্রাকে করে দেশের বিভিন্ন স্থানে অক্সিজেনযুক্ত পানির ট্যাংকে জীবন্ত মাছ নিয়ে যাওয়া হয়। এই আধুনিক জলীয় পরিবহন পদ্ধতির কারণে বাজারে রাজশাহীর জীবন্ত মাছের চাহিদা সবচেয়ে বেশি। রাজশাহী থেকে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২০ কোটি টাকার বিভিন্ন প্রজাতির মাছ বিক্রি হচ্ছে।
একমাত্র রাজশাহী জেলার পবা উপজেলার পারিলা গ্রাম থেকেই প্রতিদিন অন্তত ৫০ ট্রাক জীবন্ত মাছ রাজধানীসহ অন্যান্য বড় শহরে যায়। পারিলা গ্রামের মাছ চাষি ও ব্যবসায়ী মোশাররফ হোসেন দীর্ঘ ১৪ বছর ধরে এই পদ্ধতিতে মাছ পাঠাচ্ছেন। ২২ বিঘা জমিতে পুকুর রয়েছে তাঁর। তিনি জানান, আগে শুধু স্থানীয় বাজারে মাছ বিক্রি করতেন। এখন ট্রাকে করে ঢাকার নিউ মার্কেটসহ বিভিন্ন বাজারে জীবন্ত মাছ পাঠাচ্ছেন। এতে ভালো দাম পাওয়া যাচ্ছে। একটি ট্রাকে সাধারণত ১ হাজার ২০০ কেজি মাছ পাঠানো যায়, যার বাজারমূল্য প্রায় ৩ লাখ টাকা।
আগে রাজশাহীতে ঐতিহ্যগত মিশ্র পদ্ধতিতে (রুই, কাতলা, সিলভার কার্প ও দেশীয় ছোট মাছ) চাষ হলেও বর্তমানে তা আধুনিক রূপ পেয়েছে। এছাড়া পাবদা, শিং, কই ও মাগুরের মতো সুস্বাদু দেশীয় মাছের বাণিজ্যিক চাষও ব্যাপকভাবে বেড়েছে। রাজশাহী থেকে নিয়মিত ভারতের বাজারে রপ্তানি হচ্ছে পাবদা মাছ। মাছ চাষিদের দক্ষতা বাড়াতে মৎস্য অধিদপ্তর বছরে দেড় হাজারেরও বেশি চাষিকে আধুনিক প্রযুক্তি ও নিরাপত্তার ওপর প্রশিক্ষণ দিচ্ছে।
তবে এ খাতের আশানুরূপ বিকাশে কিছু চ্যালেঞ্জও তৈরি হয়েছে। চাষিরা জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক সময়ে মাছের খাবারের (ফিশ ফিড) আকাশচুম্বী দাম এবং ট্রাক ভাড়া বৃদ্ধি পাওয়ায় উৎপাদন খরচ অনেক বেড়ে গেছে। মৎস্য খাদ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে সরকারি নজরদারি, আর্থিক প্রণোদনা এবং সহজ শর্তে ঋণ সুবিধা পেলে এই সম্ভাবনাময় খাতটি দেশের অর্থনীতিতে আরও বড় ভূমিকা রাখতে পারবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
শেয়ার করুন
বস্তনিষ্ঠ সংবাদের একমাত্র অনলাইন ঠিকানা